নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষে গঠিত কমিশনগুলোর কার্যক্রম যেন অতীতের কমিশনগুলোর মতো ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়, সে বিষয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট চিন্তক, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরড্যাপ মিলনায়তনে ‘নীতি গবেষণা কেন্দ্র’ আয়োজিত “বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী সংস্কার উদ্যোগ: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সংস্কার কমিশনগুলোর রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ‘চব্বিশের রাষ্ট্র সংস্কার: কতটা স্বপ্ন কতটা বাস্তব’ শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়।
সংস্কার নিয়ে শঙ্কা ও বাস্তবতা
অনুষ্ঠানে কি-নোট স্পিচ উপস্থাপন করেন নীতি গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহম্মেদ। তিনি বলেন, “ব্রিটিশ আমল থেকে সংস্কারের জন্য অসংখ্য কমিশন গঠিত হয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে উত্তেজনাকর হলেও চূড়ান্তভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমরা আশঙ্কা করি, ২০২৪ পরবর্তী সংস্কার কমিশনগুলোর পরিণতি যেন ৭১-পরবর্তী কমিশনগুলোর মতো বেহাল না হয়।”
উপনিবেশিক কাঠামো ও অলিগার্কি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেন, “আমাদের দেশ এখনো সংস্কারের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি কারণ এটি এখনো উপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। গত ৫৬ বছরে আমরা যে অলিগার্কি (Oligarchy) তৈরি করেছি, তারা শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। ক্ষমতার ভাগাভাগি বা ‘হালুয়া-রুটি’ না পেলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মাথা নষ্ট হয়ে যায়।”
সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের অভিযোগ
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বর্তমান সরকারকে ‘সেনাসমর্থিত’ উল্লেখ করে বলেন, “আট আগস্ট ২০২৪ সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে আরেকটি আমেরিকার আজ্ঞাবহ সরকার গঠন করা হয়েছে। ডক্টর ইউনুস রাজনৈতিক সংস্কার না করে লুটেরা এলিটদের সাথে কথা বলছেন; সাধারণ জনগণের দাবিকে গুরুত্ব দেননি।” তিনি শিক্ষা ও আর্থিক খাতে কমিশন গঠন না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আবারও গণঅভ্যুত্থানের শঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো নতুন প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারও একটা গণঅভ্যুত্থান হতে পারে।” রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে আগে সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান বর্তমান সরকারের সংস্কার করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বাংলাদেশ জাসদের যুগ্ম সচিব মনজুর আহমেদ এবং এনসিপি-র যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার তুষার রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের অভাব ও দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য দিক
নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি প্রফেসর ড. মাহবুবুল হকের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক ড. তৌফিক এম হক। আলোচনায় ২০২৪ সালে গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশন এবং ২০২৫ সালে গঠিত ১টি জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এসআইপিজি-র (নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি) উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সালাউদ্দিন এম. আমিনুজ্জামান, রিসার্চ ফেলো ড. খান শরীফুজ্জামানসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকবৃন্দ।