
লাইফস্টাইল ডেস্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘আমার হিয়া আমায় খ্যাপিয়ে বেড়ায় যে’। কিন্তু যাপিত জীবনে অনেক সময় দেখা যায়, হৃদয় নিজে খ্যাপে না, বরং সুকৌশলে তাকে ‘খ্যাপানো’ হয়। বর্তমানে অনলাইন বা পপ-কালচারে বহুল পরিচিত শব্দ ‘গ্যাসলাইটিং’ আসলে কোনো সাধারণ মিথ্যাচার নয়; এটি এক সুনির্দিষ্ট মানসিক নির্যাতন, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়।
গ্যাসলাইটিং হলো এমন এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যজনকে তার নিজের স্মৃতি, বিচারবুদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। ১৯৩৮ সালের একটি নাটক ও ১৯৪৪ সালের বিখ্যাত সিনেমা ‘গ্যাসলাইট’ থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কাছের মানুষের স্মৃতি বা উপলব্ধিকে ভুল প্রমাণ করার এই প্রক্রিয়া মূলত কাজ করে শ্রদ্ধাবোধের ওপর ভর করে।
গ্যাসলাইটাররা সরাসরি কোনো কাজ না করে আচরণের একটি নির্দিষ্ট ধারা বা প্যাটার্ন তৈরি করে:
স্মৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি: আপনি যা দেখেছেন বা শুনেছেন, তারা তার সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্করণ দেবে এবং আপনাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করবে।
অনুভূতিকে তুচ্ছ করা: আপনাকে ‘অতিরিক্ত সংবেদনশীল’ বা ‘ইমোশনাল’ বলে অভিযুক্ত করবে।
দোষারোপের রাজনীতি: নিজেদের ভুলের জন্য আপনাকে লজ্জিত বা অপরাধী বোধ করাবে।
বিচ্ছিন্নকরণ: আপনাকে বন্ধু বা আত্মীয়দের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে পুরোপুরি নিজের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে।
গ্যাসলাইটিং এতটাই সূক্ষ্ম যে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও তা বুঝতে পারেন না। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি: ১. নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সবসময় দ্বিধায় ভোগা। ২. অকারণে বারবার ক্ষমা চাওয়া (পরিস্থিতি শান্ত রাখতে)। ৩. ওই ব্যক্তির আশপাশে থাকলে প্রচণ্ড স্নায়বিক চাপে ভোগা। ৪. আত্মমর্যাদার অভাব বোধ করা। ৫. ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন আসা এবং প্রিয় কাজগুলোতে আনন্দ হারিয়ে ফেলা।
নিজেকে ফিরে পেতে মনোবিজ্ঞানীরা কিছু কার্যকরী পদক্ষেপের পরামর্শ দেন:
একাকীত্ব দূর করুন: বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন। একা হয়ে পড়লে গ্যাসলাইটাররা বেশি সুবিধা পায়।
প্রমাণ রাখুন: আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখুন বা ফোনে রেকর্ড করুন। এটি আপনার স্মৃতিশক্তির ওপর নিজের আস্থা ফেরাতে সাহায্য করবে।
সীমানা নির্ধারণ: তর্কে না জড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় নিজের অবস্থান জানান। যেমন— "আমাদের স্মৃতি ভিন্ন হতে পারে, তাই এই আলোচনা এখানেই শেষ করি।"
পেশাদার সহায়তা: পরিস্থিতি জটিল হলে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।
উপসংহার: গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হওয়া মানে আপনার কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি অন্য পক্ষের এক অনৈতিক আচরণ। নিজের অনুভূতির ওপর আস্থা রাখা এবং প্রয়োজনে নিরাপদ উপায়ে এমন সম্পর্ক ত্যাগ করাই সুস্থ থাকার একমাত্র পথ।