আন্তর্জাতিক ডেস্ক | শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন বারুদের গন্ধ আর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। আজ শনিবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে শুরু করেছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং তেহরানের ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টা।
আটলান্টিক কাউন্সিলের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতামতের ভিত্তিতে এই যুদ্ধের বহুমুখী প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন:
১. ট্রাম্পের জীবনের বৃহত্তম ‘পলিটিক্যাল গ্যাম্বল’
আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান স্ট্র্যাটেজি প্রজেক্টের পরিচালক নেট সোয়ানসন একে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জুয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইতিপূর্বে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও, এবার তিনি সরাসরি ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মূল স্তম্ভগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। ট্রাম্পের ধারণা, আকাশপথের প্রচণ্ড হামলায় আইআরজিসি-র (IRGC) চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেলে সাধারণ ইরানিরা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজপথে নামবে।
২. ক্ষমতার শূন্যতা ও ‘আইআরজিসিস্তান’ সৃষ্টির শঙ্কা
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন পানিকফ এক গভীর সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান শাসনের পতন মানেই গণতন্ত্র নয়; বরং ক্ষমতার শূন্যতায় জন্ম নিতে পারে ‘আইআরজিসিস্তান’। যেখানে রেভল্যুশনারি গার্ডস সরাসরি সামরিক শাসন জারি করতে পারে। এর ফলে ইরান লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
৩. রেডলাইন অতিক্রম ও মার্কিন সামরিক বিশ্বাসযোগ্যতা
আটলান্টিক কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথু ক্রোনিগ মনে করেন, এই যুদ্ধ অনিবার্য ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প ইরানকে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন না চালাতে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তেহরান সেই ‘রেডলাইন’ অতিক্রম করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করায় আমেরিকা এই হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হয়েছে।
৪. ইরানের পাল্টা আঘাত ও প্রক্সি যুদ্ধ
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স প্লিটাস পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ইরান তার ২,০০০ থেকে ৩,০০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার কামিকাজে ড্রোনের পূর্ণ শক্তি এখনও ব্যবহার করেনি। তবে আইআরজিসি ইতিমধ্যেই কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা শুরু করেছে। এটি তাদের জন্য এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
৫. বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চড়া মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে:
-
তেল সরবরাহ: হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণায় বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধের মুখে।
-
জ্বালানির দাম: ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
-
স্বর্ণের বাজার: ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম ইতোমধ্যে ২২ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের চরম আতঙ্কে রেখেছে।
৬. পশ্চিমা বিশ্বের মেরুকরণ
সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকায়ার জানিয়েছেন, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য পরোক্ষভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও স্পেন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপের বড় ভয় হলো, ইরান অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হলে নতুন করে অভিবাসী স্রোত শুরু হতে পারে। অন্যদিকে, আমেরিকার ভেতরেও সাইবার হামলা ও কর্মকর্তাদের ওপর গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালাতে পারে ইরান।
উপসংহার
ইসরায়েলি বিশ্লেষক মাইকেল রোজেনব্ল্যাট-এর মতে, ইসলামি বিপ্লবের পরীক্ষা এখন শেষ পর্যায়ে। তবে এই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের অস্থিরতার মূল উৎপাটন সম্ভব হবে। আর যদি ইরান তার প্রক্সি বাহিনী (হিজবুল্লাহ, হুথি, শিয়া মিলিশিয়া) নিয়ে পূর্ণ মাত্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে এটি ২১ শতকের বৃহত্তম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।