
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীপুর ও দোহাজারী
ফাল্গুন-চৈত্র এলেই যেন আগুনের অভিশাপ নেমে আসে গাজীপুরের শ্রীপুর রেঞ্জের ভাওয়াল সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও চট্টগ্রামের দোহাজারী রেঞ্জের পাহাড়ে। বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি এখন দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে। এতে কেবল গাছপালাই নয়, পুড়ে ছাই হচ্ছে বন্যপ্রাণী ও পাখির আশ্রয়স্থল, যা পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর চরম আঘাত হানছে।
শ্রীপুর রেঞ্জ ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের অধীনে থাকা প্রায় ৯ হাজার ৭১২ হেক্টর সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি বিশাল অংশ ইতিমধ্যে আগুনের কবলে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রীপুর রেঞ্জের অর্ধেকের বেশি এবং রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের ৪০ হেক্টরের প্রায় সবটুকু বনভূমিই পুড়ে গেছে। বিশেষ করে সাতখামাইর, গোসিঙ্গা, সিমলাপাড়া এবং সদর বিটের গাজিয়ারন এলাকায় আগুনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।
আগুন নেভানোর চেষ্টায় বন বিভাগের পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষ। গাজিয়ারন গ্রামের শফিকুল ইসলাম মাস্টার আক্ষেপ করে বলেন, "যে পরিমাণ আগুন লেগেছে, তা কয়েকজন মানুষের পক্ষে নেভানো সম্ভব নয়। তবুও আমরা চেষ্টা করছি প্রকৃতিকে বাঁচাতে।"
একই ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের দোহাজারী রেঞ্জে। দোহাজারী-ধোপাছড়ি সড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাহাড়ি বনজ ও ফলদ গাছ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুকনো মৌসুমে জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য কিছু মানুষ পরিকল্পিতভাবে বনে আগুন ধরিয়ে দেয়। দোহাজারী রেঞ্জের রেঞ্জার মনোয়ার ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে তিনি নিজে ১০-১২ বার আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তবে দুর্গম পাহাড়ে আগুনের সূত্রপাত নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বনাঞ্চলে আগুন দেওয়া ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিতে ইতিমধ্যে পুরস্কার ঘোষণা করেছে স্থানীয় বন বিভাগ। শ্রীপুর সদর বিটের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান জানান, প্রতিটি বিটে মাইকিং করে জনসচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন বলেন, “বনের আগুন প্রতিরোধের জন্য একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা আগামী মৌসুম থেকে কার্যকর হবে। তবে বন রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।”
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, প্রতিবছর এই সময়ে রহস্যজনক আগুনের কারণে বনের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে। গজিয়ে ওঠা কচি চারা (কপিজ বৃক্ষ) পুড়ে যাওয়ায় বনের স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশকর্মীরা এই 'রহস্যময়' আগুনের স্থায়ী সমাধান ও দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।