৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আধিপত্যে আপত্তি নাকি শুধু ভারতে? জেনজি প্রতিনিধিদের প্রতি এক নাগরিকের খোলা প্রশ্ন

admin
প্রকাশিত ০১ এপ্রিল, বুধবার, ২০২৬ ১২:৫৪:৪৫
আধিপত্যে আপত্তি নাকি শুধু ভারতে? জেনজি প্রতিনিধিদের প্রতি এক নাগরিকের খোলা প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

সম্প্রতি সংসদে দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘জেনজি’ (Gen-Z) প্রজন্মের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করা এবং বাহাত্তরের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পরিবর্তনের আহ্বানের তীব্র সমালোচনা করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে এই বক্তব্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, এই দাবির পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি কতটা আর আবেগের ‘মববাজি’ কতটা?

জেনজির প্রতিনিধি দাবি: যুক্তি নাকি শ্লোগান?

সংসদে দাঁড়িয়ে একজন এমপির ‘আমিই জেনজির প্রতিনিধি’ বলে উচ্চকণ্ঠ হওয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলা হচ্ছে, নোয়াখালী-৬ আসনের নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়া মানেই পুরো প্রজন্মের ওপর ‘আসমানি ফরমান’ হওয়া নয়। সমালোচকরা বলছেন, জেনজি প্রজন্মের কত শতাংশ এই উগ্র পরিবর্তনের পক্ষে, তার কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান ছাড়াই এমন দাবি করা কি কেবল মব-কালচারের রাজনীতি নয়? সংসদ কোনো মবের মাইক হতে পারে না; এখানে প্রতিটি দাবির পেছনে সুনির্দিষ্ট যুক্তি ও ব্যাখ্যা থাকা বাঞ্ছনীয়।

বাহাত্তরের সংবিধান ও ৪৭-এর মোহ

সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাদ দেওয়ার যে প্রস্তাব তোলা হয়েছে, তাকে ‘পুরানো পাকিস্তানি মানসিকতার সংস্করণ’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে:

  • কেন ৪৭-এর গুরুত্ব? পাকিস্তান আন্দোলনের সেই মুসলিম জাতীয়তাবাদ কি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, যার শেষ পরিণতি ছিল বাঙালির ওপর শোষণ ও গণহত্যা?

  • বিকল্প কী? বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলের কথা বললে তার পরিবর্তে কেমন রাষ্ট্র চাওয়া হচ্ছে—যেখানে কি শোষণমুক্ত সমাজ বা ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার কোনো স্বীকৃতি থাকবে না?

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও সমাজতন্ত্রের দ্বিচারিতা

প্রতিবেদনে আধিপত্যবাদ বিরোধিতার বুলি এবং সমাজতন্ত্র ত্যাগের মানসিকতার মধ্যে এক বড় ধরণের বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভাষা হলো সমাজতন্ত্র।

“যদি সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা সত্যি রাজনৈতিক অবস্থান হয়, তবে সমাজতন্ত্রকে ভয় কেন? পুঁজির আধিপত্য, করপোরেট দখল আর বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্রই তো সমাজতন্ত্র।”

এখানেই মূল প্রশ্নটি দানা বাঁধে—আপত্তি কি সামগ্রিক আধিপত্যবাদে, নাকি কেবল প্রতিবেশী দেশ ভারতে? যদি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও শোষণহীন সমাজের দর্শন ছাড়াই কেবল ভারতবিরোধিতা করা হয়, তবে তা নীতিগত অবস্থান নয়, বরং স্রেফ ‘নির্বাচিত শত্রু’ বেছে নেওয়ার রাজনীতি।

৭১ বনাম ৪৭: ইতিহাসের কাঠগড়ায়

বাংলাদেশ কোনোভাবেই ১৯৪৭-এর প্রকল্পের ধারাবাহিকতা নয়, বরং ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সত্য। ৪৭-এর মোহে পড়ে ৭১-এর অর্জনকে খাটো করার চেষ্টা দেশের ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।

নাগরিক সমাজ স্পষ্ট দাবি তুলছে—খালি চেঁচামেচি বা আবেগ নয়; ইতিহাস, দর্শন এবং যুক্তির আলোকেই জেনজি প্রতিনিধিদের জবাব দিতে হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কেবল ভূ-রাজনৈতিক শ্লোগানে নয়, বরং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং অভ্যন্তরীণ বৈষম্যমুক্ত কাঠামোর ভেতরেই সুরক্ষিত।