
বিশেষ প্রতিবেদন:
গত চার দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিবর্তনে আলী লারিজানি ছিলেন এক অপরিহার্য নাম। কট্টরপন্থী পারিবারিক উত্তরাধিকার, পশ্চিমা দর্শনে অগাধ পাণ্ডিত্য এবং তীক্ষ্ণ কূটনৈতিক প্রজ্ঞা—এই তিনের সমন্বয়ে তিনি নিজেকে বিশ্বমঞ্চে এক স্বতন্ত্র কৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তবে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাকে এক শান্তিবাদী আলোচক থেকে সরাসরি যুদ্ধের প্রধান সেনাপতিতে রূপান্তরিত করেছে।
আলী লারিজানি ১৯৫৮ সালের ৩ জুন ইরাকের নাজাফে এক উচ্চপদস্থ শিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিত আয়াতুল্লাহ মির্জা হাশেম আমোলি। তাঁর পরিবার ইরানের রাজনীতিতে এতটাই প্রভাবশালী যে ২০০৯ সালে 'টাইম' ম্যাগাজিন লারিজানি ভাইদের ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। উল্লেখ্য, তাঁর ভাই সাদেক লারিজানি ইরানের প্রধান বিচারপতি এবং মোহাম্মদ জাভেদ লারিজানি মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
লারিজানি ইরানের সেই বিরল নেতাদের একজন, যারা ধর্মীয় ও পশ্চিমা শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ১৯৭৯ সালে শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক করার পর তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেন। ১৮শ শতাব্দীর জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন তাঁর গবেষণার মূল বিষয়। কান্টের 'যৌক্তিক নীতিবাদ' তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সবসময় প্রতিফলিত হতো।
বিপ্লবী সূচনা: আশির দশকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ডে (আইআরজিসি) যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু।
সংস্কৃতি ও সম্প্রচার: প্রেসিডেন্ট রাফসানজানির অধীনে সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং পরে ১০ বছর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার (IRIB) প্রধান ছিলেন।
পারমাণবিক আলোচনা: ২০০৫ সালে প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে নিযুক্ত হন, তবে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের সাথে মতভেদের কারণে পদত্যাগ করেন।
স্পিকারের দায়িত্ব: ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) অনুমোদনে তিনি প্রধান ভূমিকা রাখেন।
২০২১ ও ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে। তবে ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁকে পুনরায় সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দিলে লারিজানি আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসেন।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলি হামলার পর লারিজানির অবস্থান কঠোর হতে শুরু করে। তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সব সহযোগিতা বাতিল করেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর এক চরম সংকটের মুখে পড়ে ইরান। এই ক্রান্তিকালে আলী লারিজানি ইরানের অঘোষিত ‘সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক’ এবং যুদ্ধের প্রধান কৌশলী হিসেবে আবির্ভূত হন।
নিহত হওয়ার ঠিক আগে তাঁর শেষ হুংকার ছিল:
"আমেরিকা ও ইসরায়েলি হামলা ইরানের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। ইরান এমন প্রতিশোধ নেবে যা ইতিহাসে নজিরবিহীন হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটি যা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে, তা সরাসরি আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হবে।"