
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২রা এপ্রিল, ২০২৬
ইরানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ‘প্রস্তর যুগে’ বা পাথর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক মিনিটের মাথায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) মাত্র চারটি শব্দে সেই হুমকির প্রতিধ্বনি করেন— ‘ব্যাক টু দ্য স্টোন এজ’ (পাথর যুগে ফিরে যাও)।
সামরিক পরিভাষায় কোনো দেশকে পাথর যুগে পাঠানোর অর্থ হলো সেখানে নির্বিচারে ‘কার্পেট বোম্বিং’ বা আকাশপথে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো। এর মূল লক্ষ্য হলো একটি দেশের আধুনিক অবকাঠামো— বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেশটিকে প্রাগৈতিহাসিক ও আদিম অবস্থায় নিয়ে যাওয়া।
আল্টিমেটাম: আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
লক্ষ্য: ট্রাম্পের ভাষায়, "আমরা তাদের পাথর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।"
বর্তমান ক্ষয়ক্ষতি: গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে ২ হাজারের বেশি ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে হাসপাতাল, স্কুল ও ওষুধ কারখানাসহ হাজার হাজার বেসামরিক স্থাপনা।
কাউকে বোমা মেরে পাথর যুগে পাঠানোর হুমকি মার্কিন কূটনীতি ও সামরিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। এটি মূলত কয়েক দশকের পুরোনো এক রণকৌশল:
১. ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৬৫): মার্কিন জেনারেল কার্টিস লেমে প্রথম উত্তর ভিয়েতনামকে এই হুমকি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে ‘ক্রিসমাস বোম্বিং’-এর মাধ্যমে হ্যানয় ও হাইফং শহরে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২. উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯১): ইরাকের কুয়েত দখলের পর তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইরাককে পাথর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মে ‘ডাম্ব’ বোমার আঘাতে ইরাকের আধুনিক অবকাঠামো ধূলিসাৎ করা হয়। ৩. উত্তর কোরিয়া (১৯৫০-৫৩): কোরিয়া যুদ্ধের সময় উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এবং ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস করে দিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। ৪. পাকিস্তান ও ৯/১১: টুইন টাওয়ার হামলার পর তালেবান বিরোধী যুদ্ধে যোগ না দিলে পাকিস্তানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠানোর হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন কর্মকর্তা রিচার্ড আর্মিটেজ।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সিকিউরিটি বিভাগের অধ্যাপক জেনিনা ডিল আল জাজিরাকে বলেন:
"বেসামরিক শিল্প, শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ট্রাম্পের এই হুমকি প্রমাণ করে যে, এটি কেবল ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো ইরানি সমাজ ও জনগণের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ।"
বিশ্লেষণ: আমেরিকার জন্মের হাজার বছর আগেই পারস্য সভ্যতা যখন বিজ্ঞান ও দর্শনে শিখরে ছিল, সেই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দেশটিকে আধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান দিয়ে ‘আদিম’ যুগে পাঠানোর এই ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। আগামী দুই-তিন সপ্তাহ বিশ্ববাসীর নজর থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের দিকে।