৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৭ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

ইরানেরই জয়, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়নি ইরান

admin
প্রকাশিত ২৬ জুন, বৃহস্পতিবার, ২০২৫ ০১:০২:২৩
ইরানেরই জয়, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়নি ইরান

Manual5 Ad Code
  • এই যুদ্ধে ইসরায়েলে নিহত ৩০ জন। আহত ৩ হাজার।
  • ইরানে নিহত ৯০০, আহত ৪ হাজার মানুষ।
  • মার্কিন গোয়েন্দার তথ্য, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার তেমন ক্ষতি হয়নি।

 

 

 

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ১২ দিনের যুদ্ধ থেমেছে। ইসরায়েল নিজেদের বিজয়ী দাবি করে উল্লাস করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কৌশলগত জয় দাবি করেছেন। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্যে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এই যুদ্ধে ইরান একা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা হার মানেনি। মার্কিন হামলার পর খোদ ট্রাম্পকে এই যুদ্ধের রাশ টানতে হয়েছে। সে হিসেবে এই যুদ্ধে ইরানেরই জয় হয়েছে।

Manual1 Ad Code

কোনো যুদ্ধেই হতাহতের সংখ্যার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। আর কোনো দেশের সরকারও এই প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করতে চায় না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষণ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুসারে, ১২ দিনের এই যুদ্ধে ইরানে প্রায় ৯০০ জন নিহত হয়েছে। আর আহত হয়েছে প্রায় ৪ হাজার মানুষ। আর সিএনএন বলছে, ইসরায়েলে এই যুদ্ধ নিহত হয়েছে ৩০ জন। আহত ৩ হাজার।

হতাহতের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বেশি ইরান। ধ্বংসযজ্ঞ বিবেচনায় ইরান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আল জাজিরা বলছে, এই সংঘাতে ইরানের অন্তত ১৪ বিজ্ঞানীকে হত্যা করার দাবি করেছে ইসরায়েল। তাঁদের মধ্যে রসায়নবিদ, পদার্থবিদ ও প্রকৌশলী রয়েছেন।

ইরানের ক্ষয়ক্ষতি

ইসরায়েল শুরু থেকে ইরানে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র যাতে ছুড়তে না পারে, সেই লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি অনুসারে, ইরানের প্রায় দেড় শ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র ধ্বংস করেছে তারা। এ ছাড়া শেষ দিকে একের পর এক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ। যুদ্ধবিরতির আগমুহূর্তে ছয়টি বিমানবন্দরে হামলা চালায় তারা। এ ছাড়া ইরানের রাজধানী তেহরানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়েও হামলা চালিয়েছে তারা। হামলা হয়েছে ইরানের রাডার ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট সেন্টার এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে।

Manual7 Ad Code

এদিকে হামলার শুরু থেকে ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় প্রতিদিনই ইরানের এসব স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে বেশির ভাগ হামলা চালিয়েছে আইডিএফ। তবে এর খুব কম সংখ্যকই ঠেকাতে পেরেছে ইরান। উল্টো দিকে ইরান কোনো যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেনি এই সংঘাতে। ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারেই হামলা চালিয়েছে।

ইরানে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সরকার এখনো তা বলেনি। তবে ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার যে ক্ষতি হয়েছে, সেই অভিযোগ জাতিসংঘে উত্থাপন করবে ইরান সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই ক্ষতিপূরণ চাইবে তারা।

যদিও এ নিয়ে খানিকটা সাংঘর্ষিক তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, গতকাল বুধবার ইরানের পার্লামেন্টে জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধের বিল নিয়ে আলোচনায় স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে পারেনি। এ ছাড়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতেও ইসরায়েলের হামলার কোনো প্রভাব পড়েনি; বরং তাদের হামলায় ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে ইরান সরকার যখন বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাতিসংঘের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ চাইবে, তার অর্থ হলো, কমবেশি যা-ই হোক, ক্ষতি হয়েছে। এদিকে ফ্রান্সে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত জোশুয়া জারকা দাবি করেছেন, এসব হত্যাকাণ্ডের ফলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা থেকে যে পারমাণবিক অবকাঠামো ও উপকরণ টিকে আছে, সেগুলো দিয়ে ইরানের পক্ষে অস্ত্র তৈরি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ইসরায়েলের ক্ষতি কম নয়

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড়াই ছিল আয়রন ডোম, ডেভিড স্লিং ও অ্যারো সিস্টেম। যুদ্ধের প্রথম দিতে এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বেশ কাজেও এসেছিল। কিন্তু ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করার পর খানিকটা বিপাকে পড়ে ইসরায়েল। দেশটির জ্বালানি স্থাপনা, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা এবং সামরিক স্থাপনাও বেশ ক্ষতি হয়েছে তেহরানের হামলায়।

ইরান মূলত দুটি শহরে বেশি হামলা চালিয়েছে—তেল আবিব ও হাইফা। জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণার আগে তেল আবিব ছিল ইসরায়েলের রাজধানী। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সেখানে রয়েছে। এ ছাড়া হাইফায় ইসরায়েলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি, বেশ কিছু তেল শোধনাগার ও বহু রাসায়নিক কারখানা আছে। মূলত এসব গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে সামরিক স্থাপনা কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ করেনি ইসরায়েল। এ ছাড়া ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ করতে মন্ত্রীর তরফ থেকে সাংবাদিকদের নিষেধ করা হয়েছে। অনেক এলাকায় সাংবাদিকদের ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। তবে বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, আইডিএফ যতটুকু স্বীকার করেছে, সেটাও কম নয়। এই বাহিনীর তথ্য অনুসারে, অন্তত ৫০টি সফল হামলা হয়েছে ইসরায়েলে।

এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কতটা ক্ষতি হয়েছে, তার তথ্য উঠে এসেছে ক্ষতিপূরণের আবেদনে। ইসরায়েলের গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণ চেয়ে ৩৯ হাজার ইসরায়েলি আবেদন করেছে। অর্থাৎ ইসরায়েল সরকার ক্ষয়ক্ষতি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও শেষমেশ সেটা বেরিয়ে আসছে।

ট্রাম্পের তথ্য নিয়ে শঙ্কা

ইরানে তিন পারমাণবিক স্থাপনা—ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলার পরপরই ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন, এই তিন স্থাপনা একেবারে ধসে গেছে। কিন্তু এক দিন পরই গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, আসলে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর। এই স্থাপনাগুলোর প্রবেশপথ ধসে গেছে। কয়েক মাস পিছিয়ে গেছে কর্মসূচি।

Manual2 Ad Code

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হামলার আগেই ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ সরিয়ে ফেলে। এতে হামলায় পারমাণবিক উপাদানের খুব সামান্যই ধ্বংস হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ ইরানের গোপন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিয়ে নেদারল্যান্ডসে গিয়েও ট্রাম্প বলেছেন, হামলা চালিয়ে ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাটি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। তিনি দাবি করছেন, গণমাধ্যম মিথ্যা বলছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে তাঁদের যে অভিযান, তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ইরান আর পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য হুমকি নয়।

Manual1 Ad Code

যদিও কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তাঁরাও মনে করেন, ইরান কিছু ছোট ও গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে; যেন বড় স্থাপনা আক্রান্ত হলেও কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়া যায়।

হার না মানা ইরান

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ১৯৬৭ সালে আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল ইসরায়েল। ছয় দিনের ওই যুদ্ধে মিসর, জর্ডান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা পেয়েছিল ইসরায়েল। তবে ওই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়ায়নি। তারপরও ছয় দিনে আরব দেশগুলো পিছু হটেছিল। তবে এবার গেল ভিন্ন চিত্র। ইরান ১২ দিন একা প্রতিরোধ গড়ল। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা চালিয়েও ইরানকে নতি স্বীকার করাতে পারল না; বরং তাড়াহুড়া করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানাল ইসরায়েল। এদিকে ইরান বরং এখনো সরাসরি বলেনি, তারা যুদ্ধবিরতি করেছে। শুধু বলেছে, ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে তারাও হামলা বন্ধ করবে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ইসরায়েল এককভাবে রাজি হয়েছে। সে কারণে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছে।