বিশ্লেষণ | ০২ মার্চ, ২০২৬
১৯৪৪ সালে তৎকালীন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যাচেস্লাভ মোলোটভ বলেছিলেন, ‘ইরানের ভাগ্য নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন উদাসীন থাকতে পারে না।’ আট দশক পর বর্তমানের পুতিন প্রশাসনের জন্যও এই বাক্যটি সমানভাবে সত্য। কিন্তু গত শনিবার শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে আমেরিকা ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানকে যে চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলেছে, তাতে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সেই ‘কৌশলগত স্থাপত্য’ ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
গর্জনের আড়ালে মস্কোর সীমাবদ্ধতা
ইরানে হামলার প্রতিবাদে ক্রেমলিন কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়ে একে ‘বিনা উস্কানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে। তবে এই গর্জনের আড়ালে মস্কোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। রাশিয়া কখনোই ইরানকে বাঁচাতে আমেরিকা বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াবে না। বর্তমানে মস্কোর প্রধান মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে। বিশ্লেষকরা একে দেখছেন রাশিয়ার ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ বা কৌশলগত ঝুঁকি এড়ানোর নীতি হিসেবে।
কূটনৈতিক কাঠামোর ধ্বংস ও একাকীত্ব
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাশিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মধ্যস্থতাকারী’র ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ এই কূটনৈতিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল এখন আর আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে বদ্ধপরিকর। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর ইরানই ছিল এ অঞ্চলে রাশিয়ার শেষ শক্তিশালী খুঁটি; এখন সেটিও নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় মস্কো এক চরম একাকীত্বের মুখে পড়েছে।
ড্রোন রাজনীতি ও পাল্টে যাওয়া সমীকরণ
অনেকে মনে করেছিলেন, ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে বিপাকে পড়বে, কারণ মস্কো ইরানের ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন:
-
রাশিয়া গত কয়েক বছরে ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোন প্রযুক্তি নিজের দেশে স্থানান্তর করেছে।
-
এখন রাশিয়া নিজস্ব কারখানায় এই ড্রোন বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করছে।
-
ফলে ইরানের ওপর রাশিয়ার সামরিক নির্ভরশীলতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে, যা তেহরানের সঙ্গে মিত্রতার গভীরতাকেও অনেকটা হ্রাস করেছে।
‘মাল্টিপোলার’ বিশ্বাদর্শের সংকট
রাশিয়া সবসময়ই একটি বহুমুখী বিশ্বের (Multipolar World) কথা বলে আসছে যেখানে আমেরিকা একমাত্র পরাশক্তি হবে না। মস্কোর এই বর্ণনায় ইরান ছিল পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রধান প্রতিরোধ শক্তি। কিন্তু আমেরিকা ও ইসরায়েল যদি সফলভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দিতে পারে, তবে বিশ্বজুড়ে এই বার্তাই যাবে যে—পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।
ভবিষ্যৎ আতঙ্ক: শরণার্থী ও চীনের প্রভাব
ইরান যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে শরণার্থী সংকট এবং উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটাতে পারে। এছাড়া মস্কোর সামনে বড় আতঙ্ক এখন চীনকে নিয়ে। কারণ এই যুদ্ধের পর ইরান যদি টিকে থাকে, তবে তারা রাশিয়ার চেয়ে চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক শক্তি রাশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় যুদ্ধোত্তর ইরানে চীনের প্রভাবই হবে প্রশ্নাতীত।
উপসংহার
রাশিয়া বর্তমানে এক উভয়সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যস্ততা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের প্রভাব বিলীন হওয়ার শঙ্কা। ক্রেমলিনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও কীভাবে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখা যায়। তবে চলমান ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের দিনগুলো হয়তো দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে।