
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নুরিয়েল রুবিনি দাবি করেছেন, ইরানের বর্তমান ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এর পতন ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।
গত নভেম্বরে দেওয়া নিজের পূর্বাভাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রুবিনি জানান, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েলি হামলা ছিল অনিবার্য। তার মতে, ইসরায়েলের মধ্যপন্থী ও কট্টরপন্থী—উভয় পক্ষই ইরানকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে।
১. ইসরায়েলের হামলা ও মার্কিন ভূমিকা: রুবিনি মনে করেন, ইরান যখন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন ইসরায়েলের সামনে আঘাত হানা ছাড়া বিকল্প ছিল না। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত রয়েছে, তবে ইরানের সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে মার্কিন কারিগরি বা পরোক্ষ সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. অর্থনৈতিক দেউলিয়াপনা ও বৈষম্য: বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে ইরান ও ইসরায়েলের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় সমান থাকলেও বর্তমানে ইসরায়েলের জিডিপি ইরানের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি। রুবিনির মতে, "আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা ইরানিদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। এটি নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি শাসকদের দুর্নীতি ও ভুল নীতির ফল।"
৩. আঞ্চলিক প্রক্সিদের পরাজয়: ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইরান তার প্রক্সি বাহিনীগুলোকে (হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েল এই নেটওয়ার্ককে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে দেওয়ায় তেহরান তার কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা হারিয়ে এখন কোণঠাসা।
৪. জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক প্রভাব: ১৯৭৩ বা ১৯৭৯ সালের মতো এবার তেলের বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় বা 'স্ট্যাগফ্লেশন' হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন রুবিনি। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎপাদনকারী (যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব) থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতি এই যুদ্ধ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
৫. নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন: রুবিনি বলেন, "ইসরায়েল আসলে পশ্চিমা বিশ্বের হয়ে 'নোংরা কাজ' (Dirty work) সম্পন্ন করছে।" তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইরানে একটি 'যুক্তিবাদী' শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরবে, সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের পথ খুলবে।
রুবিনির মতে, ইরানের জনগণই এই পরিবর্তনের মূল কারিগর হবে। গত কয়েক দশকে বারবার বিদ্রোহ করা ইরানিরা এবার হয়তো চূড়ান্তভাবে তাদের শাসকদের প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে পুনরায় যুক্ত হতে চাইবে।