
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১৫ মার্চ ২০২৬
রিয়াদ/দুবাই: পারস্য উপসাগরে তেলের ট্যাংকারে আগুনের লেলিহান শিখা আর ইরান কর্তৃক কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে হাহাকার শুরু হয়েছে। এই চরম সংকটে বিশ্ববাজারের প্রবেশপথ সচল রাখতে চার দশক আগে নির্মিত নিজেদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করেছে সৌদি আরব।
মঙ্গলবার সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের নিশ্চিত করেছেন যে, কয়েক দিনের মধ্যেই এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক ৭ মিলিয়ন (৭০ লাখ) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব মরুভূমির বুক চিরে এই ৭৫০ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইনটি তৈরি করেছিল। বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর প্রস্তুতি নেওয়ায় এবং অ-ইরানি জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় এটিই এখন পারস্য উপসাগরীয় তেল রপ্তানির প্রধান ও একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।
এটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেল পৌঁছে দেবে, যা একদিকে যেমন সৌদি রাজকোষ সচল রাখবে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার জন্য মূল্যবান সময় এনে দেবে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ৪ মিলিয়ন ব্যারেল পরিশোধিত পণ্য যাতায়াত করে। বর্তমানে বিকল্প পথগুলো চালু থাকলেও বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও:
ব্রেন্ট ক্রুড: সোমবার ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার ৮৯ ডলারে থিতু হলেও বাজার এখনো অত্যন্ত অস্থির।
রিফাইন্ড প্রোডাক্ট সংকট: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট শুধু অপরিশোধিত তেলের নয়, বরং ডিজেল ও জেট ফুয়েলের। বিশেষ করে ইউরোপ তাদের চাহিদার বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে জ্বালানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সাময়িক স্বস্তি দিলেও লোহিত সাগর উপকূল এখন নতুন ঝুঁকির মুখে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ গ্রেগ প্রিডির মতে, তেল সরবরাহের রুট ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নেওয়ায় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এছাড়া এশিয়ায় তেল পাঠাতে হলে জাহাজগুলোকে ‘বাব এল-মান্দেব’ প্রণালি পার হতে হয়, যা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
হরমুজ বন্ধ হওয়ায় ইরাক, বাহরাইন ও কুয়েতের জ্বালানি উৎপাদন কার্যত থেমে গেছে।
বাহরাইন: তাদের তেল উৎপাদক সংস্থা বিপকো ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে।
কাতার: বিশ্বের ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহকারী এই দেশটি উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: ড্রোন হামলায় তাদের অন্যতম বৃহৎ রুওয়াইস শোধনাগারে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ: ইরান অত্যন্ত সতর্কভাবে সৌদি অবকাঠামো লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি করছে যাতে বিশ্ব অর্থনীতি বিপন্ন হয়, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো এড়ানো যায়। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে এবং হুতিরা পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধে যোগ দিলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।