আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়া যুদ্ধ (Shadow War) এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর এটি স্পষ্ট যে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেমন ইরানকে তাদের ‘পেছনের উঠান’ বানিয়ে ফেলেছে, ইরানও তেমনি পাল্টা কৌশলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহার করে শক্তিশালী এক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও অনুপ্রবেশ
ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, বিজ্ঞানী এবং সামরিক কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। গত বছরের যুদ্ধে তারা ইরানের মধ্যাঞ্চলে দূরনিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থা ব্যবহার করে খোদ ইরানের ভেতর থেকেই হামলা চালিয়েছে। এমনকি কিছু ইরানি নাগরিককে নিয়োগ দিয়ে ‘প্রযুক্তিগতভাবে পরিবর্তিত যানবাহন’ পাচার করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তারা।
ইরানের পাল্টা কৌশল: ‘ডিজিটাল নিয়োগ’
ইসরায়েলের মতো গভীর কৌশলগত সক্ষমতা না থাকলেও ইরান গত কয়েক বছরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সমাজ ও গোয়েন্দা কাঠামোয় প্রবেশের চেষ্টা বাড়িয়েছে।
-
টার্গেট: আর্থিক সংকটে থাকা ইসরায়েলি নাগরিক, আজারি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি এবং কিশোর ও তরুণরা (বয়স ১৩ থেকে ৭৩ বছর)।
-
মাধ্যম: টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনলাইনে নিয়োগ।
-
লেনদেন: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ প্রদান।
সাধারণ কাজ থেকে ‘হত্যাকাণ্ডের’ পরিকল্পনা
শুরুর দিকে ইরান তাদের এজেন্টদের দিয়ে সামরিক ঘাঁটির ছবি তোলা বা সরকারবিরোধী পোস্টার লাগানোর মতো সাধারণ কাজ করালেও, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে তারা সরাসরি হত্যাচেষ্টা (Assassination) এবং অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা দিতে শুরু করে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ (Shin Bet)-এর মতে, ইরানের প্রধান লক্ষ্য ছিল:
-
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত এবং শিন বেত প্রধানকে হত্যা করা।
-
পারমাণবিক বিজ্ঞানী, সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করা।
‘ইজি মানি, হেভি প্রাইস’
ইরানের এই ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ইসরায়েল দেশব্যাপী বিশেষ সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছে। তারা নাগরিকদের সতর্ক করছে যে, মাত্র ১,৫০০ ডলারের লোভে পড়ে তথ্য দিলে বা কোনো কাজ করলে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
গোয়েন্দা যুদ্ধের পরিসংখ্যান
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলে ইরানের ৩৯টি গুপ্তচর অভিযানের প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনায় খোদ ইসরায়েলি নাগরিকরাই জড়িত ছিল। যদিও ইরানের কোনো হত্যাচেষ্টা এখনো সফল হয়নি, তবে ইসরায়েলি পুলিশ বিষয়টিকে ‘নজিরবিহীন হুমকি’ হিসেবে দেখছে।
উপসংহার: দুই দেশের গোয়েন্দা সক্ষমতা ও দক্ষতার স্তরে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও, ইরান এখন ইসরায়েলের ভেতরে ‘অভ্যন্তরীণ আগ্রাসনের কৌশল’ নিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলও তাদের চিরশত্রুর এই ডিজিটাল অনুপ্রবেশ রুখতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হতে বাধ্য হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা।