২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৩রা রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

ইশকে এলাহির আলোকবর্তিকা: হজরত রাবেয়া বসরির (রহ.) আধ্যাত্মিক জীবন

admin
প্রকাশিত ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, ২০২৬ ১২:৫১:২৮
ইশকে এলাহির আলোকবর্তিকা: হজরত রাবেয়া বসরির (রহ.) আধ্যাত্মিক জীবন

Manual3 Ad Code

নিভৃতচারী এক মহান সাধিকা হজরত রাবেয়া বসরি (রহ.) সুফিবাদের ইতিহাসে এমন এক নাম, যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন কেবল স্রষ্টার প্রেমে। ধনসম্পদ, জান্নাতের লোভ কিংবা জাহান্নামের ভয়—কোনো কিছুই তাঁর এই অবিচল ইবাদতকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই, আর তা হলো প্রভুর পরম সন্তুষ্টি।

জন্ম ও কণ্টকাকীর্ণ শৈশব

৭১৪ থেকে ৭১৮ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে বসরায় এক হতদরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশবেই তিনি এতিম হন এবং চরম অভাবের মুখে এক দস্যু দলের হাতে অপহৃত হয়ে ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি হন। কিন্তু দাসত্বের নিগড় তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তাকে বন্দি করতে পারেনি। গভীর রাতে তাঁর দীর্ঘ মোনাজাত ও অলৌকিক জ্যোতি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁর মালিক তাঁকে মুক্তি দেন। এরপরই শুরু হয় তাঁর নিভৃতচারী ও কঠোর সাধনার জীবন।

নিঃস্বার্থ প্রেমের দর্শন: জান্নাত-জাহান্নামের ঊর্ধ্বে

রাবেয়া বসরির আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল কথা ছিল ‘ইশকে এলাহি’ বা আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো কেন তিনি জান্নাতের আশায় ইবাদত করেন না, তিনি কালজয়ী এক উত্তর দিয়েছিলেন:

Manual5 Ad Code

“আমি যদি জাহান্নামের ভয়ে ইবাদত করি, তবে আমি হবো এক হীন শ্রমিক। আর যদি জান্নাতের আশায় ইবাদত করি, তবে আমি হবো এক লোভী বান্দা। আমি ইবাদত করি কেবল তাঁর ভালোবাসা আর সুন্দরের জন্য।”

রাতের নির্জনতায় নিভৃত আলাপ

রাতের শেষ প্রহরে যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ত, তখন তিনি স্রষ্টার সান্নিধ্যে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। তাঁর সেই আবেগঘন মোনাজাত আজও ভক্তদের হৃদয়ে নাড়া দেয়: “হে প্রভু! বাদশাহরা তাদের তোরণ বন্ধ করে দিয়েছে, প্রেমিকরা এখন তাদের প্রিয়তমের সান্নিধ্যে। আর আমি এখানে একাকী তোমার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে।”

Manual2 Ad Code

সুফিবাদের উচ্চশিখরে পৌঁছানোর দুই রহস্য

আধ্যাত্মিকতার এই চূড়ায় তিনি কীভাবে পৌঁছালেন? রাবেয়া বসরির মতে এর মূলমন্ত্র দুটি: ১. অনর্থক বিষয় ত্যাগ: যা পরকালের কল্যাণে আসবে না, তা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়া। ২. অবিনশ্বর বন্ধুত্ব: ক্ষণস্থায়ী মানুষের বদলে চিরস্থায়ী আল্লাহর সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করা।

Manual2 Ad Code

স্রষ্টা ও সৃষ্টির মেলবন্ধন

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ। তবে তিনি বলতেন, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তাঁর হৃদয়ে এতটাই পূর্ণ যে, সেখানে অন্য কারও জন্য পৃথক জায়গা নেই। মূলত স্রষ্টার মাধ্যমেই তিনি তাঁর সৃষ্টি ও নবীকে ভালোবাসতেন।

৮০১ খ্রিষ্টাব্দে এই মহান সাধিকা পরলোকগমন করেন। তাঁর জীবন আজও আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইবাদত কোনো লেনদেন নয়, বরং এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার এক নিবিড় ও নিঃস্বার্থ প্রেমের সম্পর্ক।

Manual4 Ad Code