১৮ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৯শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ: মৌলিক অধিকার যখন পণ্য

admin
প্রকাশিত ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার, ২০২৬ ২০:১১:২৫
উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ: মৌলিক অধিকার যখন পণ্য

Manual8 Ad Code

বিশেষ বিশ্লেষণ ১৭ মার্চ, ২০২৬

Manual8 Ad Code

ভূমিকা: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা

‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সামাজিক অধিকার’—এই শ্লোগানটি আজ বাংলাদেশে এক বড় প্রশ্নের সম্মুখীন। আশির দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যোগদানের পর রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উচ্চশিক্ষার প্রসারে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের যাত্রা শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল অলাভজনক ও জনকল্যাণমূলক শিক্ষা বিস্তার। কিন্তু তিন দশক পরে দেখা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষা ক্রমশ একটি দামী ‘সেবা’ বা ‘পণ্যে’ রূপান্তরিত হয়েছে।

বাণিজ্যিকীকরণের সূচক ও আকাশচুম্বী ব্যয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন স্বল্পতা এবং মধ্যবিত্তের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য জ্ঞানচর্চার চেয়ে মুনাফা অর্জন।

  • ব্যয় বৈষম্য: দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান বা ব্যবসায় অনুষদে স্নাতক শেষ করতে খরচ হচ্ছে ১১ থেকে ১৬ লাখ টাকা।

  • গ্রাহক বনাম শিক্ষার্থী: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন ‘সেবা প্রদানকারী’ এবং শিক্ষার্থীরা ‘গ্রাহক’। মেধা ও গবেষণার চেয়ে অবকাঠামোগত প্রদর্শন এবং সেমিস্টার বৃদ্ধির দিকেই কর্তৃপক্ষের নজর বেশি।

বেকারত্ব ও সামাজিক সংকট

উচ্চমূল্যে শিক্ষা ‘ক্রয়’ করেও তরুণ সমাজ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না।

Manual3 Ad Code

পরিসংখ্যান বলছে: ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের মধ্যে বেকার সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত বেকারদের হার প্রায় ৭৯ শতাংশ। জমিজমা বা শেষ সম্বল বিক্রি করে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর যখন পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ হয় না, তখন শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এমনকি অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।

শ্রেণিবৈষম্য ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ টিউশন ফি সমাজে এক নতুন ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে। দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে:

  1. ২০১৫: ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন।

  2. ২০১৮: নিরাপদ সড়ক আন্দোলন।

  3. ২০২৪: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (যেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন)।

সংকটের উত্তরণ: যা করণীয়

উচ্চশিক্ষাকে মানবিক অধিকার হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

  • অভিন্ন নীতিমালা: পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক ও অভিন্ন সেমিস্টার এবং গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা।

    Manual3 Ad Code

  • টিউশন ফি নিয়ন্ত্রণ: আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টিউশন ফি নির্ধারণ এবং প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা নিশ্চিত করা।

  • গবেষণা ও নিরাপত্তা: পিএইচডির অনুমোদন প্রদান, শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং কার্যকর গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া।

    Manual1 Ad Code

  • কারিকুলাম উন্নয়ন: শুধুমাত্র বাজারের চাহিদাপূর্ণ বিষয় নয়, মানবিক গুণাবলি অর্জনে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া।

উপসংহার

উচ্চশিক্ষা যদি কেবল একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির অধিকার হয়ে দাঁড়ায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। মুনাফার প্রবণতা কমিয়ে শিক্ষাকে মেধা ও মানবিকতার মাপকাঠিতে ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।