
উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের সমবায় সমিতি নিয়ে বিরোধ
নানা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :: রাজধানীর উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রেতা-বিক্রেতা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, মামলা-মোকদ্দমা ও বিরোধ চলে আসছে। সমিতির বর্তমান ও সাবেক সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতবিরোধকে কেন্দ্র করে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমও বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সমিতি সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ভোক্তাদের কাছে ন্যায্যমূল্যে পণ্যসামগ্রী বিক্রির লক্ষ্যে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে বাজার কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে রাজউকের মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্লট ২০, ২১ ও ২১এ-তে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হকার, ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষের সমন্বয়ে প্রায় ৪৬০টি দোকানঘর স্থাপন করা হয় বলে তারা জানান।
পরবর্তীতে যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম শেষ হলে কয়েকজন সাধারণ ব্যবসায়ী সমবায় নীতি ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেন। তাদের উদ্যোগে ২০০৮ সালে জেলা সমবায় কার্যালয়, ঢাকা থেকে ‘আজমপুর উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রেতা-বিক্রেতা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সমিতিটি নিবন্ধন লাভ করে। সমিতির নিবন্ধন নম্বর ৮০৩ এবং নিবন্ধনের তারিখ ২৮ ডিসেম্বর ২০০৮ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও হামলার অভিযোগ
সমিতির সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিবন্ধনের পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে সমিতির স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাদের দাবি, ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ নাম ব্যবহার করে একটি সংগঠনের কার্যক্রমের কারণে সমিতি দীর্ঘদিন চাপে ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন আইনগত জটিলতার মুখে ওই কার্যক্রমও গুটিয়ে নেওয়া হয়।
সমিতি সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বাজারের ব্যবসায়ী ও সমবায়ী সদস্যদের ওপর হামলা, মারধর এবং অফিসের মালামাল ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে ২০২১ সালের ২৭ জুন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও তারা দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
বাজারের ব্যবসায়ী মো. জাকির বলেন, “বাজার শুরুর সময় থেকেই সাধারণ ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। একটি চক্র বিভিন্ন সময়ে সমবায়ী সদস্যদের হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক সময় দোকান থেকে মালামাল নেওয়ার পর টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগও রয়েছে। টাকা চাইতে গেলে হুমকি দেওয়া হয়।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
সম্পাদকের বক্তব্য
সমিতির বর্তমান সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং দীর্ঘদিন ধরে সমিতি ও বাজারের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে কাজ করে আসছেন।
তিনি বলেন, “এই সমিতি ও বাজারকে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। সমিতি ও বাজারের স্বার্থে নিজের মালিকানাধীন দোকানঘর পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। আমি রাজনীতি বুঝি না। বাজারের স্বার্থে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের কাছে যেতে হয়েছে। মামলাসহ নানা জটিলতার কারণে আজ আমি নিঃস্বের মতো জীবনযাপন করছি।”
সমিতির সদস্যসংখ্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, “সমিতিতে কমবেশি ১ হাজার ৩৪৯ জন সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই সমিতির স্বাভাবিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন না। যারা অভিযোগ করছেন, তাদের পাসবই ও সদস্যপদ যাচাই-বাছাই করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে থাকা কোনো কোনো ব্যক্তি নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুলসংখ্যক সদস্য অন্তর্ভুক্ত বা প্রভাবিত করেছেন। আবার সমিতির অনুমতি ছাড়া দোকানপ্রতি দৈনিক টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সমিতির স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়েছে।”
তার দাবি, সমিতির নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তিনি বলেন, “আমি সবসময় চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। কারা কত টাকা নিয়েছে, কার কী সম্পদ হয়েছে—তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি।”
সমিতির আর্থিক সংকট
সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জানান, সমিতির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নানা প্রতিকূলতার কারণে নিয়মিত মাসিক সঞ্চয়ী আমানত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্লট নিয়ে তিনটি মামলা চলমান রয়েছে বলেও তিনি জানান।
তার দাবি, মামলা পরিচালনা, অধিদপ্তরের দাপ্তরিক ব্যয় ও অন্যান্য খাতে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু সমিতির নির্দিষ্ট কোনো আয়-উৎস নেই।
তিনি জানান, ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অফিসের আয়তন কিছুটা কমিয়ে দুটি দোকানঘর নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো ভাড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। তার অভিযোগ, দোকান ভাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিলে বহিরাগতদের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হয়। আবার বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সমিতির প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “আমি চাই সঠিক তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা হোক। যারা সমিতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, তারা সমিতির উন্নয়নে কতটা সময় দিয়েছেন এবং কতটুকু সহযোগিতা করেছেন, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।”
আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, “দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর ধরে মামলা-মোকদ্দমা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এই বাজার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। আমি চাই ন্যায়বিচার হোক। আমার ও আমার পরিবারের ওপর যেন আর কোনো ধরনের জুলুম না হয়।”
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের বক্তব্য
বাজারের আরেক ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তির কারণে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। ভালো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা বাধা সৃষ্টি করেন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নূর নবী নামে এক ব্যক্তি ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় এবং বাজারের দোকান কেনাবেচার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে অর্থ আদায় করেছেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে সুবিধা নিয়েছেন।
রফিকুল ইসলামের এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্য
সমিতির বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে সমিতিটি অবহেলিত ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করেছি।”
তিনি জানান, সমিতির প্লটগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে নতুন একটি মামলা করা হয়েছে, যা বর্তমানে চলমান।
বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং অন্তর্বর্তী কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর প্রসঙ্গে মাহফুজুল হক বলেন, “আমাদের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন অন্তর্বর্তী কমিটির কাছে আমরা বা আমাদের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব হস্তান্তর করব। তাদের কার্যক্রমে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।”