১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২২শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

এআই-চালিত ড্রোন যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে প্রথাগত রণকৌশলের পতন ও ‘প্রিসাইজ মাস’-এর উত্থান

admin
প্রকাশিত ১০ মার্চ, মঙ্গলবার, ২০২৬ ২৩:৪৭:১২
এআই-চালিত ড্রোন যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে প্রথাগত রণকৌশলের পতন ও ‘প্রিসাইজ মাস’-এর উত্থান

Manual5 Ad Code

বিশেষ সামরিক বিশ্লেষণ | ১০ম ও ১১তম দিন

ইরান বনাম আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাত এখন আর কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘এআই-চালিত ড্রোন যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ—উভয় পক্ষই এখন ‘প্রিসাইজ মাস’ (Precise Mass) বা নিখুঁত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কৌশলে ঝুঁকছে।

১. ‘লুকাস’ বনাম ‘শাহেদ’: ড্রোনের লড়াইয়ে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং

অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ধাপেই পেন্টাগন এক চমকপ্রদ অস্ত্রের ব্যবহার করেছে—‘লুকাস’ (LUCAS)। এটি মূলত ইরানের বিখ্যাত ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের একটি মার্কিন সংস্করণ। মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে শাহেদ ড্রোনকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমেরিকা এই একমুখী (One-way) আত্মঘাতী ড্রোনটি তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, পেন্টাগন এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ ফাইটার জেটের পাশাপাশি সস্তা ড্রোনের গুরুত্ব অনুভব করছে।

Manual1 Ad Code

২. অর্থনৈতিক বৈষম্য: ৪০ লাখ বনাম ২০ হাজার ডলার

ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে শিখিয়েছে যে, রণক্ষেত্রে এখন দামি অস্ত্রের চেয়ে ‘নিখুঁত ও ব্যাপক’ সস্তা অস্ত্রের গুরুত্ব বেশি। একটি শাহেদ বা লুকাস ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অথচ একে ভূপাতিত করতে যে ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল ব্যবহার করা হয়, তার প্রতিটির দাম প্রায় ৪০ লাখ (৪ মিলিয়ন) ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবধানের কারণে শত্রুর ড্রোনের ঝাঁক সামলাতে গিয়ে রক্ষা বাহিনীর প্রতিরক্ষা বাজেট ও ইন্টারসেপ্টর মিসাইল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

Manual6 Ad Code

৩. ইন্টারসেপ্টর সংকট ও জেলেনস্কির সতর্কতা

যুদ্ধের ১০ম দিনে এসে মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন মিসাইল সংকট দেখা দিয়েছে।

  • সংযুক্ত আরব আমিরাত: ইতিমধ্যে ১৭৪টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ৬৯০টি ইরানি ড্রোন মোকাবিলা করতে গিয়ে তাদের মজুত প্রায় শেষ করে ফেলেছে।

  • উৎপাদন ঘাটতি: লকহিড মার্টিন ২০২৫ সালে মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরি করেছে, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

    Manual4 Ad Code

  • ইউক্রেনের পর্যবেক্ষণ: প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে গত তিন দিনে যত প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহৃত হয়েছে, তা ইউক্রেন যুদ্ধের গত চার বছরের মোট ব্যবহারের চেয়েও বেশি।

৪. ড্রোন প্রযুক্তির চার স্তর

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বর্তমান যুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোনগুলোকে চারটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করছেন:

  1. ট্যাকটিক্যাল সারভাইভাল ড্রোন: সামনের সারির নজরদারির জন্য।

  2. হেইল ও মেইল ড্রোন: যেমন তুর্কি টিবি-২ বেয়রাক্তার বা মার্কিন প্রক্সিমিটি ড্রোন।

  3. একমুখী (One-way) অ্যাটাক ড্রোন: শাহেদ বা লুকাসের মতো আত্মঘাতী ড্রোন।

  4. কলাবরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্রাফট: ফাইটার জেটের ‘লয়াল উইংম্যান’ হিসেবে কাজ করা ড্রোন।

৫. আগামীর যুদ্ধ হবে ‘অস্ত্র কারখানায়’

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের জয়-পরাজয় এখন নির্ধারিত হবে কারখানায়। রাশিয়া বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজারটি ‘গেরান-২’ ড্রোন তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। বিপরীতে আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বছরে মাত্র ৫০০টি তৈরি করা সম্ভব। আমেরিকার ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভরতা এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সস্তা অস্ত্রের ধাক্কায় দামি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ভেঙে পড়ছে।

উপসংহার: ইরান যুদ্ধের এই ১০ দিন প্রমাণ করেছে, আগামী দিনের যুদ্ধে সেই দেশই টিকে থাকবে যারা সস্তায়, দ্রুত এবং হাজার হাজার এআই-চালিত ড্রোন তৈরি করতে পারবে। আমেরিকার জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা—কেবল বিশাল যুদ্ধবিমান বা সাবমেরিন দিয়ে এই ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ (Drones Swarm) বা ড্রোনের ঝাঁক মোকাবিলা করা অসম্ভব।

Manual2 Ad Code