বিশেষ প্রতিবেদন | ২৮ মার্চ, ২০২৬
ভারতের কেরালা রাজ্যের কাসারগড় জেলা। একসময় যা পরিচিত ছিল কাজু বাদাম, চা আর আম চাষের উর্বর ভূমি হিসেবে। কিন্তু আজ সেই জনপদ বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত এক ‘বিষাক্ত উপত্যকা’ নামে। গত দুই দশক ধরে এই অঞ্চলের মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে এন্ডোসালফান নামক এক সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী কীটনাশকের অভিশাপ।
বিষের বৃষ্টি ও বিকলাঙ্গ শৈশব
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭০-এর দশকে। কেরালা প্ল্যান্টেশন কর্পোরেশন কাজু বাদাম বাগানে পোকা দমনে হেলিকপ্টার থেকে এন্ডোসালফান ছিটানো শুরু করে। টানা ২০ বছর বছরে দুই-তিনবার করে এই বিষ ছিটানো হয়। নব্বইয়ের দশকে দেখা দেয় ভয়াবহ ফলাফল।
-
পশু-পাখি: প্রথমে বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মাতে থাকে গৃহপালিত পশু।
-
মানুষ: এরপর দেখা দেয় শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটি। মস্তিষ্কে তরল জমা (হাইড্রোসেফালাস), মৃগীরোগ, সেরিব্রাল পালসি এবং ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
আলোকচিত্রীর লেন্সে ধরা পড়া কান্না
দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই ট্র্যাজেডি নিয়ে কাজ করছেন আলোকচিত্রী মধুরাজ। তাঁর ছবিগুলো সম্প্রতি ‘কোচি-মুজিরিস বিয়েনাল’-এ প্রদর্শিত হয়েছে, যা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মধুরাজ বিবিসিকে জানান:
“আমি দেখেছি কীভাবে একটি বিষাক্ত ওষুধ একেকটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। অনেক পরিবারে একাধিক শিশু প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মেছে, যাদের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা দরিদ্র বাবা-মায়ের নেই।”
বিমলা ও রেশমা: এক করুণ পরিণতির গল্প
এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক উদাহরণ বিমলা ও তাঁর মেয়ে রেশমা। জন্মগতভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী রেশমার বয়স যখন ২৮, তখন মা বিমলা দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ২০২২ সালে মেয়েকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেন বিমলা। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যর্থতার এক চরম নিদর্শন।
আইনি লড়াই ও বর্তমান অবস্থা
-
২০০৪: কেরালা দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এন্ডোসালফান নিষিদ্ধ করে।
-
২০১১: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দেশজুড়ে এর উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেন। একই বছর বিশ্বজুড়ে এটি নিষিদ্ধ হয়।
-
২০১৭: সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার ভুক্তভোগীকে ৫ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিলেও অনেকের দাবি, তাঁরা এখনো সেই অর্থ পাননি।
শেষ কথা
ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই প্রান্তিক ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের। পর্যাপ্ত পুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে তাঁদের লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। মধুরাজের তোলা ছবিগুলো আজ বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—উন্নয়ন বা মুনাফার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।