
কানাডায় প্রবাসী রাজনীতির আড়ালে কথিত সিন্ডিকেট!
সিলেট প্রতিনিধি :: নতুন প্রবাসীদের অর্থ আত্মসাৎ, ব্ল্যাকমেইল ও নারীদের ঘিরে গুরুতর অভিযোগ—বিএনপির পদে থেকেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ছবি ঘিরে তোলপাড়। কানাডায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে অর্থ আদায়, প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ঘিরে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে কানাডা বিএনপির পূর্ব শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এম. জয়নাল আবেদীন জামিল এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মিজির নাম। একই সঙ্গে সংগঠনটির সভাপতি এজাজ আক্তার তৌফিকের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীদের একাংশ। ২০২৪ সালের ১ মে বিএনপির অনুমোদিত কানাডা পূর্ব শাখার কমিটিতে এজাজ আক্তার তৌফিক সভাপতি, সিরাজুল ইসলাম মিজি সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং জয়নাল আবেদীন জামিল সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান—প্রকাশ্য সংবাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক পদ-পদবির এই পরিচয়ের আড়ালে আসলে কী ঘটছে—সেটিই এখন অনুসন্ধানের কেন্দ্রে। নতুন প্রবাসীরাই কি কথিত টার্গেট? স্থানীয় কয়েকজন বাংলাদেশির অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় নতুন আসা শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী ও সাধারণ প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, পরিচিতি, কাজ কিংবা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অর্থ দেওয়ার পর প্রতিশ্রুত সুবিধা না পেলে টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে চাপ, ভয়ভীতি কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার আশঙ্কা তৈরি করা হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না।এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রয়োজন ভুক্তভোগীদের লিখিত বক্তব্য, ব্যাংক বা অর্থ লেনদেনের রেকর্ড, মেসেজ ও কলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি। এসব প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়া কাউকে অর্থ আত্মসাৎকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। ব্ল্যাকমেইল ও নারীদের ঘিরে আরও গুরুতর অভিযো অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশে রয়েছে ব্ল্যাকমেইল এবং নারীদের ব্যবহার করে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দাবি। অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক সংকট বা সামাজিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু নারীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি বাংলাদেশ থেকে আসা রাজনৈতিক ব্যক্তি বা অতিথিদের ঘিরে নারী সরবরাহের মতো গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে। এই অভিযোগের সঙ্গে এজাজ আক্তার তৌফিকের নামও এসেছে বলে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেছেন। তবে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি, ভিডিও বা কারও বক্তব্যকে এককভাবে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ভুক্তভোগীর সরাসরি সাক্ষ্য, ডিজিটাল ফরেনসিক, আর্থিক লেনদেন এবং পুলিশের তদন্ত—সবকিছুর সমন্বিত যাচাই প্রয়োজন। রাজনীতির মাঠে দ্বৈত পরিচয়ের প্রশ্ন অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজনৈতিক পরিচয়।অভিযোগকারীদের হাতে থাকা বলে দাবি করা কিছু ছবিতে এম. জয়নাল আবেদীন জামিলকে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে সিরাজুল ইসলাম মিজির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ছবিগুলোর মূল উৎস, তারিখ, স্থান এবং ছবিতে ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একটি ছবি বা ভিডিওর ভিত্তিতে কারও রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতাগতভাবে নিরাপদ নয়। তাহলে প্রশ্ন—দলীয় পদে থেকেও ভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেন? যদি প্রচারিত ছবিগুলো সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—বিএনপির দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা কেন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন? এটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান, পূর্বের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নাকি কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক বা নির্বাচনী কর্মসূচি—তা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং মূল ভিডিও/ছবি যাচাই করেই নির্ধারণ করা সম্ভব। এখানেই প্রয়োজন দলীয় অভ্যন্তরীণ তদন্তের। ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগ নতুন নয় সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে কানাডা বিএনপিকে ঘিরে কথিত ‘সিন্ডিকেট’, পদ-পদবি নিয়ে আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে জয়নাল আবেদীন জামিল ও এজাজ আক্তার তৌফিকের নামও এসেছে। তবে সংবাদ প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া আর অভিযোগ আদালত বা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। বরং একই ধরনের অভিযোগ বারবার প্রকাশ্যে এলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাধীন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাই জবাবদিহির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চার প্রশ্নের উত্তর কি মিলবে? এই ঘটনায় প্রবাসী কমিউনিটির সামনে অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে— প্রথমত: নতুন প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ আছে কি? দ্বিতীয়ত: ব্ল্যাকমেইল বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে কোনো ভুক্তভোগী কানাডার পুলিশে অভিযোগ করেছেন কি না? তৃতীয়ত: নারীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, ডিজিটাল প্রমাণ বা মামলা রয়েছে কি না? চতুর্থত: বিএনপির পদধারী ব্যক্তিদের আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ছবিগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট কী? এই চার প্রশ্নের উত্তরই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করতে পারে। দলীয় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার দাবি অভিযোগকারীরা বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের কাছে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবিগুলো হলো— ১. অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত। ২. তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দলীয় পদ থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। ৩. অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নথি, ছবি, ভিডিও ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য কানাডার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া। ৪. নতুন প্রবাসী, নারী, শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণই হোক শেষ কথা প্রবাসী রাজনীতিতে মতাদর্শ, দলীয় পদ বা সামাজিক পরিচয় ব্যক্তিগত জবাবদিহির ঊর্ধ্বে হতে পারে না। একইভাবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করাও ন্যায়সংগত নয়। তাই এই ঘটনায় প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, নথি যাচাই, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, ডিজিটাল প্রমাণ পরীক্ষা এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য প্রকাশ। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও তা পরিষ্কার করার সুযোগ দিতে হবে। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে এম. জয়নাল আবেদীন জামিল, সিরাজুল ইসলাম মিজি ও এজাজ আক্তার তৌফিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। অনুসন্ধান অব্যাহত।