সংস্কৃতি প্রতিবেদক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের প্রস্তুতির মাঝেই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আফসানা বেগমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি রাতে এক আকস্মিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই এই অব্যাহতির ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
নেপথ্যে উপদেষ্টা ফারুকীর সঙ্গে মতবিরোধ?
অব্যাহতির পর নিজের ফেসবুক পেজে চার পর্বের এক দীর্ঘ পোস্টে আফসানা বেগম দাবি করেছেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে ‘বই নির্বাচন নীতিমালা’ সংশোধন নিয়ে তাঁর তীব্র মতবিরোধই এই বিদায়ের প্রধান কারণ।
মূল বিরোধের জায়গাটি ছিল—বই নির্বাচনে মন্ত্রী ও সচিবদের জন্য নির্ধারিত ২০ শতাংশ কোটা। আফসানা বেগম এই কোটা বাতিলের প্রস্তাব দিলেও উপদেষ্টা তা বহাল রাখার পক্ষে অনড় ছিলেন। আফসানা বেগমের ভাষ্যমতে, এই কোটার মাধ্যমে কোনো নিয়ম ছাড়াই অযোগ্য ও অপাঠ্য বই লাইব্রেরিগুলোতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
ফেসবুক পোস্টে সেই কথোপকথন
আফসানা বেগম উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর আলোচনার অংশবিশেষ তুলে ধরে লিখেছেন, উপদেষ্টা ফারুকী তাঁকে বলেছিলেন—পরবর্তী সরকারের সুবিধার জন্য এই কোটা রাখা প্রয়োজন। জবাবে আফসানা বেগম প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কি পরবর্তী সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এখানে এসেছি? কোটার জন্যেই তো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হলো।” কিন্তু উপদেষ্টা বিষয়টিকে ‘কোটা’ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ ছিলেন এবং আলোচনায় বিরক্ত প্রকাশ করেন।
সংস্কার প্রস্তাব ও থমকে যাওয়া পরিকল্পনা
গত ৫ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর আফসানা বেগম জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আমূল পরিবর্তনের জন্য বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন:
-
মডেল পাঠাগার: দেশের ধুঁকতে থাকা শতবর্ষী পাঠাগারগুলোকে পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়ন।
-
আন্তর্জাতিক বইমেলা: স্থগিত হয়ে থাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা পুনরায় চালু এবং বাংলা সাহিত্য বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে অনুবাদ কার্যক্রম।
-
ডিজিটাইজেশন: পাঠাগার সংক্রান্ত গবেষণা ও আধুনিক ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া।
-
গ্রন্থনীতি: একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গ্রন্থনীতি’র খসড়া প্রণয়ন, যা পাঠাগার আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য।
প্রশ্নবিদ্ধ অব্যাহতি
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সিডাপ মিলনায়তনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সেমিনার হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই এই বিদায়কে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে দেখছেন আফসানা বেগম। তাঁর বিদায়ের পর এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের এই সংস্কার কার্যক্রম কি আদৌ আলোর মুখ দেখবে, নাকি সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে?