ঢাকা, রোববার:
চলতি সপ্তাহেই ব্যাংক বহির্ভূত ৯টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘নন–ভায়াবল’ বা অকার্যকর ঘোষণা করে অবসায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
গভর্নর বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে ব্যাংক বহির্ভূত ৯টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নন–ভায়াবল ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর লিক্যুইডেশন বা অবসায়নের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। তবে শেয়ারহোল্ডাররা কিছুই পাবেন না।’
তিনি জানান, গত ৮ ডিসেম্বর ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫–এর আওতায় নয়টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন দেয়। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা, লিকুইডেটর নিয়োগ, সম্পদ বিক্রি এবং প্রাপ্ত অর্থ পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টনের পূর্ণ ক্ষমতা পেয়েছে।
ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্সে আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূতকরণ, পুনর্গঠন অথবা বন্ধ করার পদ্ধতি উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধের নির্দেশনাও এতে অন্তর্ভুক্ত।
এর আগে এই আইনের আওতায় পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক’ গঠন করা হয়। চলতি মাসে লেনদেনে আসা এই নতুন ব্যাংকটি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক।
যেসব প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে
অবসায়নের অপেক্ষায় থাকা নয়টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো—
এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই এই নয়টি প্রতিষ্ঠানের। গত বছরের শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা।
এই নয়টির মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি গড় নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৯৫ টাকা। অর্থাৎ সম্পদ বিক্রি করেও দায় পরিশোধ করা কঠিন এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।
১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত আটকে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী মিলিয়ে এই নয়টি প্রতিষ্ঠানে মোট ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানত আটকে আছে। এর মধ্যে একক গ্রাহকের আমানত ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ও করপোরেট আমানতকারীর ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
একক আমানত আটকে থাকার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে পিপলস লিজিং, যেখানে ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা আটকে আছে। এরপর রয়েছে আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি টাকা, প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা এবং এফএএস ফাইন্যান্সে ১০৫ কোটি টাকা।
সংকটের পেছনের কারণ
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের এই সংকটের মূল কারণ দীর্ঘদিনের দুর্বল নজরদারি, অনিয়ম ও শাসনব্যবস্থার ঘাটতি। অনেক প্রতিষ্ঠান সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানো এবং লোকসান কম দেখানোর মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করেছে।
এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন্স ডিপার্টমেন্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করে, যেখানে এই নয়টি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে তালিকাটি ব্যাংক রেজোলিউশন ডিপার্টমেন্টে পাঠানো হয়।
এর আগে ১০ মাসের মূল্যায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২০টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘লাল’ ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত করে। তালিকায় থাকা বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠান হলো— সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামিক ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, উত্তরা ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।