সুনির্মল সেন | বিশেষ প্রতিবেদন
চট্টগ্রাম: মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মহানগর জজ আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে (প্রভু) হাজিরা প্রদানের সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে এই দৃশ্যটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
আদালতের আঙিনায় যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি
একজন বিচারাধীন নাগরিককে আদালতে আনা ও নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক সংখ্যক প্রশাসনিক বাহিনীর উপস্থিতি, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট এবং যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির অনুরূপ দৃশ্য জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই পরিবেশ দেখে মনে হতে পারে তিনি কোনো বিচারাধীন নাগরিক নন, বরং বিশ্বসেরা কোনো শীর্ষ মাফিয়া। এই ধরনের উপস্থাপনা ব্যক্তির ‘মানব মর্যাদা’ ও ‘ব্যক্তিগত সম্মান’–এর পরিপন্থী।
আইনি ও সাংবিধানিক লঙ্ঘন
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে ‘Presumption of Innocence’ বা ‘দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’ গণ্য করার বিশ্বজনীন নীতি সরাসরি লঙ্ঘিত হয়েছে।
-
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩৫(৩): বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণের নিশ্চয়তা দেয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই ধরনের ভীতিমূলক পরিবেশ নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
-
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR)-এর অনুচ্ছেদ ১ ও ১১ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া, কিন্তু সেই সুরক্ষা যখন অপমানজনক উপস্থাপনে রূপ নেয়, তখন তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
ক্ষমতার প্রদর্শনী নাকি ভীতি সৃষ্টি?
প্রশ্ন উঠেছে, এই কঠোর নিরাপত্তা আসলে কার জন্য? এটি কি অভিযুক্তের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, নাকি জনমনে একটি ভীতি সৃষ্টির পরিকল্পিত প্রদর্শনী? চিন্ময় প্রভুর মতো একজন সন্ন্যাসীকে এভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে না বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
পর্যালোচনার দাবি
রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইন ও শৃঙ্খলার সুরক্ষা দেওয়া, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ণ না হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া কলঙ্কিত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। চট্টগ্রামের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যে নজির স্থাপিত হয়েছে, তা অবিলম্বে পর্যালোচনা ও সংশোধনের দাবি জানানো হচ্ছে। বিচার হোক আইনের আলোকে এবং মর্যাদার সাথে—ভয় বা শক্তির প্রদর্শনীর মাধ্যমে নয়।