মন্তব্য প্রতিবেদন: যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের সামনে সন্ধ্যা নামতেই থামে একটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে কোনো অসুস্থ মানুষ নয়, ছিল এক তরুণী মা ও তার মাত্র ৯ মাস বয়সী শিশুপুত্রের নিথর দেহ। কারাগারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সেই মরদেহের সামনে দাঁড়ান এক বন্দি স্বামী ও বাবা—বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম।
স্ত্রী ও সন্তানের জীবিত মুখ দেখার আশায় পরিবার তার প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তাকে শেষ দেখা দেওয়ার সুযোগ দিল কেবল লাশের সামনে দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) ও শিশু নাজিমের মরদেহ দেখে ভেঙে পড়েন সাদ্দাম। জেলগেটের সেই নীরব কান্না যেন কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং সময়ের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ। ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল তার শিশুপুত্রের নিথর দেহ। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্বর্ণালীর ভাই শুভ জানান, পাঁচ বছর আগে সাদ্দামের সঙ্গে তার বোনের বিয়ে হয়। সংসার স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে সাদ্দাম গ্রেপ্তার হন। এরপর একের পর এক মামলায় তাকে কারাগারে থাকতে হয়। শুভের ভাষায়, স্বামীর কারাবাস স্বর্ণালীকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।
মুক্তির আশায় সে বহু জায়গায় ঘুরেছে। কিন্তু কোনো আশার আলো না পেয়ে গভীর হতাশায় ডুবে যায়। সেই মানসিক বিপর্যয় থেকেই সে নিজের শিশুকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করে পরে নিজে আত্মহত্যা করে বলে পরিবারের দাবি। কিন্তু এই মৃত্যু কি কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি? নাকি এটি ইন্টিরিম সরকারের সময়কালের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি ভয়ংকর প্রতিফলন? ইন্টিরিম সরকারের আমলে বাড়ছে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক গ্রেপ্তার, মামলা ও হয়রানির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেককে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে।
কোথাও ভাঙচুর, কোথাও অগ্নিসংযোগ, কোথাও দখলের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে, বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক থানায় একাধিক মামলা দেওয়া হচ্ছে। জামিন পেলেও নতুন মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এতে কার্যত মুক্তির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন পরিবারগুলো। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কারাগারে থাকায় স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মা পড়ছেন চরম মানবিক সংকটে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপ।
সাদ্দামের পরিবারের মতো বহু পরিবার আজ দীর্ঘ অপেক্ষা, ভয় আর অপমানের ভেতর দিন কাটাচ্ছে। কেউ সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারছেন না, কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না, কেউ আবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থী। বিচার ছাড়াই শাস্তি, দীর্ঘ কারাবাস, পরিবারের ওপর পরোক্ষ চাপ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং পরিকল্পিতভাবে একটি রাজনৈতিক শক্তিকে সামাজিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া। একটি মৃত্যু শুধু মৃত্যু নয়! যশোর জেলগেটের সামনে থেমে থাকা সেই অ্যাম্বুলেন্স কেবল দুটি লাশ বহন করছিল না। সেটি বহন করছিল প্রশ্ন, ক্ষোভ আর নিঃশব্দ আর্তনাদ। একটি তরুণীর ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একটি শিশুর নিভে যাওয়া জীবন আর একজন বাবার অসহায় চোখ আজ দেশের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকবে। সরকার বদলাবে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রতিহিংসার পথে হাঁটে, তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। সেদিন জেলগেটের সামনে যে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল, সেখানে শুধু একটি পরিবার নয়, অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল মানবিকতার এক টুকরো আলোও।