
বিশ্লেষণ | ১১ মার্চ, ২০২৬
সামরিক ইতিহাসবিদ জেমস স্টোকসবারি ১৯৮৮ সালে একটি কালজয়ী পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন—গণতন্ত্র মূলত দুই ধরণের যুদ্ধে পারদর্শী। একটি ‘ছোট যুদ্ধ’, যা পেশাদাররা লড়েন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার আঁচ লাগে না; অপরটি ‘বড় যুদ্ধ’, যেখানে পুরো সমাজ একাট্টা হয়ে লড়াই করে। কিন্তু গণতন্ত্র যখন ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধে’ জড়ায়, যেখানে অর্ধেক মানুষ রণাঙ্গনে আর বাকিরা ঘরে বসে থাকে, তখনই আসল বিপর্যয় ঘটে।
বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ঠিক সেই বিপজ্জনক পথেই এগোচ্ছে। এটি এমন এক সংঘাত, যা ছোট অপারেশন হিসেবে শুরু হলেও অচিরেই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধে’ রূপ নেওয়ার সব লক্ষণ দেখাচ্ছে।
সমরতাত্ত্বিক কার্ল ভন ক্লজউইটজ বর্ণিত ‘সীমিত যুদ্ধ’ এবং স্টোকসবারির ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধ’ এক নয়। সীমিত যুদ্ধ পরিকল্পিতভাবে ছোট রাখা হয়। কিন্তু মাঝারি পাল্লার যুদ্ধ হলো এমন এক সংঘাত যা শুরুতে ছোট মনে হলেও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গত দুই দশকে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ ছিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল ছিল না, আবার পানামা বা গ্রেনাডা আক্রমণের মতো ছোট ‘পুলিশি অ্যাকশন’ও ছিল না। এই ধরণের যুদ্ধ আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল প্রশাসনের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এবং বৈদেশিক নীতির ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান আত্মসমর্পণ না করলে বোমাবর্ষণ চলতেই থাকবে। কিন্তু ইতিহাস বলে—একটি বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা সহজ, কিন্তু তার জায়গায় নতুন ও অনুগত একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। ট্রাম্প স্থলসেনা না পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, ইরান যদি অরাজকতার দিকে যায় এবং পারস্য উপসাগর অস্থির হয়ে ওঠে, তবে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর চাপে তিনি এক ফাঁদে পা দেবেন। যা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে।
ইতিহাসবিদ বারবারা তুচম্যানের মতে, আমেরিকা ভিয়েতনামে ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তারা ‘ভূ-রাজনীতি’ নিয়ে যতটা ভেবেছিল, স্থানীয় ‘সংস্কৃতি ও রাজনীতি’ নিয়ে ততটা ভাবেনি। ট্রাম্প প্রশাসনও এখন একই ভুল করছে। তাঁরা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু ইরানের ভেতরের সামাজিক কাঠামো বা জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করছেন।
২০০৩ সালে ইরাকের স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা যেভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল, বর্তমান প্রশাসনও ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। যখন কোনো ছোট যুদ্ধ মাঝারি যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন বুঝতে হবে নীতিনির্ধারকেরা সেই অঞ্চলের প্রকৃত বাস্তবতাকে চিনতে ভুল করেছেন।
ইতিহাসের জনক থুসিডাইডিস যুদ্ধ বা সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে ‘সম্মান’কে চিহ্নিত করেছিলেন। ট্রাম্পের বেলায় এই তত্ত্ব অক্ষরে অক্ষরে ফলে। তাঁর ব্যক্তিগত স্বভাব হলো যেকোনো ব্যক্তিগত অপমানের দ্রুত ও হিংস্র প্রতিক্রিয়া জানানো। ২০০৪ সালে ইরাকের ফালুজায় চারজন মার্কিন কন্ট্রাক্টরকে হত্যার পর ‘আমেরিকান সম্মান’ উদ্ধারের নামে যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তা কেবল প্রাণহানিই বাড়িয়েছিল। বর্তমান সময়েও ড্রোন হামলা বা দূতাবাস অবরোধের মতো ঘটনায় ট্রাম্পের আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া একটি ছোট সংঘাতকে বড় যুদ্ধে পরিণত করার জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বলেছিলেন, আমেরিকাকে তখনই যুদ্ধে জড়ানো উচিত যখন সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, জনগণের ব্যাপক সমর্থন এবং একটি ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ থাকবে। ট্রাম্প এই ‘পাউয়েল ডকট্রিন’কে পুরোপুরি উপেক্ষা করছেন। ভেনিজুয়েলা বা মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়াই চলছে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এক হাজার বছর টিকে ছিল কারণ তারা সরাসরি যুদ্ধ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলত। আমেরিকা যখন তার ২৫০তম বার্ষিকী পালন করছে, তখন এটি একের পর এক মাঝারি পাল্লার যুদ্ধের সম্মুখীন। যদি ট্রাম্প এই ফাঁদ থেকে বের হতে না পারেন, তবে মার্কিন জনগণ এবং শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এক বিরাট ফাটল তৈরি হবে। আর এই ধরণের অভ্যন্তরীণ বিভাজনই ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী প্রজাতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত করে।