অনলাইন ডেস্ক | বার্লিন-ব্রাসেলস
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে জার্মানি। কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে না থেকে, যুক্তরাষ্ট্র কোথায় কোথায় ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল—সেই ‘দুর্বল জায়গা’ বা সরবরাহ শৃঙ্খলের ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করছে বার্লিন। লক্ষ্য হলো, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে বিরোধ বাধলে পাল্টা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা।
ইউরোপের হাতে থাকা ‘ট্রাম্প কার্ড’
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এবং জার্মান কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপের হাতে বেশ কিছু শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে যা মার্কিন অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানতে পারে:
১. বিশাল ভোক্তা বাজার: ৪৫০ মিলিয়ন সচ্ছল ভোক্তার এই বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের (মেটা, আমাজন, গুগল) প্রবেশাধিকার সীমিত করা বা কঠোর ডিজিটাল আইন (DSA/DMA) প্রয়োগ করে বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা ইউরোপের অন্যতম বড় শক্তি।
২. এআই ও প্রযুক্তি খাতের নির্ভরশীলতা: ওপেনএআই বা মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলো তাদের ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য সিমেন্সের মতো ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপাকে ফেলা সম্ভব।
৩. জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও কেমিক্যাল: যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত ইনসুলিনের ৯০% এবং ব্র্যান্ডেড ওষুধের অর্ধেকের বেশি সক্রিয় উপাদান আসে ইউরোপ থেকে। সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত করলে মার্কিন ভোটারদের জন্য ওষুধের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
৪. সেমিকন্ডাক্টর ও লিথোগ্রাফি: উন্নত চিপ তৈরির জন্য অপরিহার্য ডাচ কোম্পানি ASML-এর মেশিন। জার্মানির জাইস ও ট্রুম্ফ এই মেশিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরবরাহ করে। ইউরোপ এই প্রযুক্তি সহযোগিতা কমিয়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্রের চিপ শিল্প স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
পাল্টা ব্যবস্থার ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা
বার্লিন ও ব্রাসেলস সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে কাজ করলেও কিছু ক্ষেত্রে তারা বেশ সতর্ক:
-
আর্থিক সম্পদ: ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা ১০.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন শেয়ার এবং ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি বন্ড ধারণ করে। এগুলো একযোগে বিক্রি করলে মার্কিন অর্থনীতিতে ধস নামানো সম্ভব হলেও, ডলারের আধিপত্যের কারণে ইউরোপ নিজেও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
-
সামরিক উপস্থিতি: ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ (যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ১০০-২০০ বিলিয়ন ডলার)। তবে রাশিয়ার হুমকির মুখে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইউরোপ এই কার্ডটি ব্যবহার করতে ইচ্ছুক নয়।
‘পুরোনো দিন আর ফিরবে না’
জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমায়ার এবং চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎজের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, পারস্পরিক অঙ্গীকারের যুগ শেষ হয়ে গেছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো ট্রাম্পের অদ্ভুত দাবিগুলো ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হতে পারে।
উপসংহার: জার্মানির এই উদ্যোগ মূলত “শান্তি চাইলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও” নীতির প্রতিফলন। বার্লিন সরাসরি সংঘাত চায় না, বরং আলোচনার টেবিলে ট্রাম্পকে এটা দেখাতে চায় যে—ইউরোপ এখন আর কেবল অনুগত মিত্র নয়, বরং পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি।