
গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি :: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সরকারি ভূমি ‘লুনি কইনা জঙ্গল চা বাগান’। সবুজে ঘেরা এই প্রাকৃতিক সম্পদ এখন অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্ট-পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি শক্তিশালী চক্র সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ড্রেজার মেশিন দিয়ে সরকারি ভূমি ও আশপাশের এলাকা থেকে মাটি-বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাগানের গাছপালা ও মাটির স্তর ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে আশপাশের কৃষিজমি ও বসতভিটাও হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকায় নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের মাত্রাও বেড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, খায়রুল, কামরুল ও জুবের নামে তিন ব্যক্তির নেতৃত্বে এ অবৈধ বালু বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই ব্যক্তিরা এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেন। তাদের মধ্যে একজন আগে বারকি শ্রমিক, অন্যজন সবজি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অপরজন নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় বিপুলসংখ্যক ড্রেজার মেশিন এবং দিনের বেলায়ও অসংখ্য মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের ভাষায়, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া ওই তিন ব্যক্তিকে স্থানীয়ভাবে ‘বালু সাম্রাজ্যের তিন সম্রাট’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুধু বালু উত্তোলন নয়, এ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে একটি লাঠিয়াল বাহিনীও সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বালুবাহী নৌকা থেকে প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ১২ থেকে ১৫ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ অর্থ ব্যবহার করে চক্রটি নিজেদের পেশিশক্তি আরও বাড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেউ কেউ হুমকি, হয়রানি ও মামলার আশঙ্কায় রয়েছেন। ফলে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনের নজরে আনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। ফলে সরকারি ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এভাবে অব্যাহতভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন চলতে থাকলে ভূমির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতভিটা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় ‘লুনি কইনা জঙ্গল চা বাগান’ ও সরকারি ভূমি রক্ষায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা, অবৈধ ড্রেজার জব্দ এবং সরকারি জমি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে অবৈধ বালু বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে খায়রুল আমিন, কামরুল ও জুবেরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সরকারি ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের আরও বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।