
দোয়ারাবাজারে এক ভূমিহীনের দখলে থাকা সরকারী জায়গা প্রভাবশালীচক্র স্টাম্পের মাধ্যমে জোরপূর্বক দখল
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত আমন রকম সরকারী ভূমি বেআইনিভাবে বিক্রয় ও জোরপূর্বক দখল করে ধানের চারা লাগনোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একদল প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। ভূমিহীন ও দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলকারী মোঃ আমির হোসেন এই সরকারী খাস জমি বন্দোবস্তের জন্য আবেদনকারীকে তাড়িয়ে দিয়ে জমি দখল এবং হালচাষের পর জমিতে আমন ধানের চারা লাগানোর চেষ্টা করেন এই প্রভাবশালী চক্রটি। এতে ভোগদখলে থাকা ভূমিহীন আমির হোসেন বাধা দিতে গেলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বাঁশতলা গ্রামের মৃত আজাদ মিয়ার ছেলে মোঃ আমির হোসেন বাঁশতলা মৌজার (জে.এল নং-০১, খতিয়ান নং-০১, এস.এ দাগ নং-৮১৮) ০.৫৮ একর বোরো রকম সরকারি খাস জমি ২০১৫ সাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছিলেন। সরকারি বিধি মোতাবেক জমিটি বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য তিনি ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই দোয়ারাবাজার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে অফিসে দরখাস্ত দাখিল করেন (যার ডকেট নং-১১৫৭)।
অভিযোগ উঠেছে, উক্ত জমি বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় আমির হোসেনের সহোদর ভাই আমির উদ্দীন ও ভাতিজা শফিকুল ইসলাম স্থানীয় বদরুল নামের এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সরকারী এই জমিটুকু ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে একই এলাকার মাহমদ আলী (পিতা- মৃত তাহের আলী মোড়ল), আলী মিয়া, মজিবুর রহমান ও মান্নান (সর্ব পিতা- মৃত আউয়াল মিয়া) এর নিকট স্ট্যাম্প করে বিক্রি করে দেন।
পরবর্তীতে ক্রেতা দাবিদার মাহমদ আলী ও তাঁর লোকজন বহিরাগতদের সাথে নিয়ে উক্ত খাস জমি জোরপূর্বক দখল ও চাষাবাদ করে আমন ধানের চারা রোপন করেন। সংবাদ পেয়ে আমির হোসেন স্থানীয় সাক্ষীদের নিয়ে বাধা দিলে প্রতিপক্ষরা ক্ষিপ্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং জমিতে গেলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি প্রদর্শন করে বলে তিনি অবিযোগপত্রে উল্লেখ করেন। গত ২৪ জুলাই সকালে ঘটনার জের ধরে স্থানীয় পাকা রাস্তায় প্রতিপক্ষরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমির হোসেনের ওপর হামলার চেষ্টা চালায় বলেও অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ভূমিহীন আমির হোসেন এর আগে সুনাসমগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে পৃথক দুটি লিখিত আবেদন করেন তিনি এবং দোয়ারা বাজার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭/১১৭(সি) ধারায় প্রতিকার চেয়ে আরো একটি আবেদন করেছেন।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত জমি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্পদ। রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিবর্গ বা মধ্যস্বত্বভোগীর খাস জমি ক্রয় বিক্রয় বা হস্তান্তরের আইনি কোন এখতিয়ার নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারি জমি বেআইনিভাবে দখল, ভুয়া দলিল বা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি বা বিক্রির চেষ্টা করা একটি ফৌজধারী অপরাধ।
দণ্ডবিধিতে সরকারি সম্পত্তি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, অন্যের বা সরকারি সম্পত্তি প্রতারণা মূলকভাবে নিজের দাবি করে বিক্রি বা হস্তান্তরের দায়ে দণ্ডবিধির ৪১৭/৪২০ ধারায় (প্রতারণা) এবং ৪৬৫/৪৭১ ধারায় (জালিয়াতি ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার) ২ বছর থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সরকারি বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে দখল করলে, দখলের পায়ঁতারা করলে কিংবা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে হস্তান্তর বা বিক্রয় করলে তা স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। উক্ত আইনের আওতায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম বা সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী মোঃ আমির হোসেন সংবাদকর্মীদের জানান,আমি ডিসি স্যার ও এসপি স্যারের নিকট আবেদন করলে এই আবেদনের কপি নিয়ে দোয়ারা বাজার থানায় গিয়ে ওসি মহোদয়কে না পেয়ে ডিউটি অফিসরের নিকট দিয়ে আসি। পরের দিন থানার এস আই মোঃ আব্দুল ওদদু ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রভাবশালী মুজিবুর রহমান গংদের জমি রোপন করতে নিষেধ করে আসলে ও মুজিবুর গংবা কিভাবে আইন অমান্য করে জমিতে চাষাবাদ করেন ধানের চারা লাগাল আমার মাথায় আসেনা। তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন,এস আই মোঃ ওদুদ মিয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে নিষেধ করার পর মুজিবুর রহমান গংরা আইন অমান্য করে কিসের জোরে জমিতে ধানের চারা রোপন করল । তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরো বলেন আমি একজন সাধারন ভূমিহীন আমার নিজস্ব কোন বসতভিটা নাই । তাই দীর্ঘদিন ধরে সরকারের এই আমন রকম ভূমির কিছু জায়গাতে বসতভিটা বানিয়ে থাকছি এবং বাকি জমিটুকু চাষ করে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলাম। এখন মুজিবুর গংদের পেশীশক্তি ও অর্থবৃত্তের মালিক হওয়ার পরও তারা ভূমিহীন সেঁজে কিভাবে আমার দখলে থাকা সরকারী এই ভূমিটুকু স্টাম্পের মাধ্যমে কিনে নিয়েছে দাবি করেন তিনি। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি জমিটুকু ভোগদখল করে এবং নিয়ম মেনে ২০১৭ সালে জায়গাটুকু বন্দোবস্তের জন্য দোয়ারাবাজার এসিল্যান্ড অফিসে আবেদনও করেছি। আমাকে প্রতিপক্ষের লোকজন হুমকি দামকী দিচ্ছে তাতে আমি পরিবার পরিজন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
এ ব্যাপারে সরকারি খাস জমি ক্রয়ের বিষয়ে বিবাদী মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, এলাকার মুরুব্বিদের সামনে রেখে আমির হোসেনের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় আমার কাছে উনার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এক কেদার জমি এবং আমির উদ্দিনের ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য তিন কেদার জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সরকারি খাস জমি ক্রয়-বিক্রয় আইনসম্মত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, আমাদের এলাকায় এভাবেই সরকারি জমি ভোগদখলদাররা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে অন্যজনের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে থাকেন।
এ ব্যাপারে তবে জমি বিক্রির এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আমির হোসেনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, আমি কোনো জমি বিক্রি করিনি। এই জমি আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছি। এখন তারা ভুয়া দলিল ও স্ট্যাম্প দেখিয়ে বলে আমরা নাকি জমি বিক্রি করেছি! আমরা জমিতে চাষের জন্য গেলে তারা আমাদের খুন করার হুমকি দেয়। আমরা ভূমিহীন মানুষ, তারা জোরদখল করে এই জমি ভোগ করতে চায়। আমরা প্রশাসনের কাছে এর সঠিক বিচার চাই।
এ ব্যাপারে দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ তরিকুল ইসলাম জানান, বাশঁতলা গ্রামের ভূমিহীন আমির হোসেন কর্তৃক পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছ লিখিত একটি অভিযোগের কপি পেয়েছি। তিনি কিছু খাস জায়গা বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করেছিলেন, তবে এখনো বন্দোবস্ত পাননি। উক্ত জায়গায় অন্য কয়েকজন দখল করে ধান রোপণ করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা সাথে সাথে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠাই। প্রাথমিকভাবে তদন্ত করে জানা যায়, আমির হোসেনের ভাই ছয় কেদারের মধ্যে তিন কেদার এবং উনার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এক কেদার জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন বলে অপরপক্ষ দাবি করছে। সেই অনুযায়ী মুজিবুর রহমান ৪ কেদার জমিতে ধান রোপণ করেছেন এবং ২ কেদার জমি আমির হোসেনের নিয়ন্ত্রণে আছে। জমিটির বন্দোবস্তের বিষয়ে আমরা উপজেলা ভূমি প্রশাসনের কাছে তথ্য চাইব। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার অরুপ রতন সিংহ বলেন,এই জায়গাগুলো যেহেতু সরকারী জায়গা কাজেই এইসব জায়গাতে বসবাস কিংবা জমি আবাদ করতে হলে উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাছাড়া কেহ জাল দলিলের মাধ্যমে কিংবা স্টাম্পের মাধ্যমে বন্দোবস্ত নিয়ে নিজেদের দাবি করে চাষাবাদ করাটা ও বেআইনী। তিনি বলেন যিনি ২০১৭ সালে বন্দোবস্তের জন্য দোয়ারাবাজার এসিল্যান্ড অফিসে আবেদন করেছেন উনি আমার অফিসে আসলে সত্যিকারের ভূমিহীন হলে যাচাই বাচাই করে সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী তহশীলদারকে ঘটনাস্থলে পাঠাইয়া জরিপ করে দেখার ও আইনগত বিধি ব্যবস্থা নেওয়া হবে হবে তিনি জানান।