আন্তর্জাতিক ডেস্ক ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় তাইগ্রে প্রদেশের হিৎসাতস গ্রাম। এক সময়কার গর্বিত কৃষক ৮৮ বছর বয়সী নিরেয়ো উবেতের দিন এখন কাটে স্বজনদের কবর খুঁড়ে। চার বছর আগে যুদ্ধ ও জাতিগত সহিংসতা থেকে বাঁচতে ঘর ছেড়েছিলেন, কিন্তু এখন তার সামনে যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম অনাহার। উবেতের ভাষায়, “শেষ পর্যন্ত আমাদের সংঘাত নয়, দুর্ভিক্ষই মারবে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও মানবিক বিপর্যয়
তাইগ্রের এই পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মার্কিন রাজনীতি ও বৈশ্বিক দাতা সংস্থাগুলোর পিছুটান। এক বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘ইউএসএআইডি’ (USAID) কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়। ইথিওপিয়া ছিল সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই সংস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। কিন্তু তহবিল বন্ধ হওয়ায় তাইগ্রের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখন জরুরি খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ (MSF) জানিয়েছে, মার্কিন সহায়তা কাটছাঁটের ফলে ২০২৫ সালজুড়ে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ও মানবিক কর্মসূচি বিপর্যস্ত হয়েছে:
-
সোমালিয়া: অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য চিকিৎসা-দুধ সরবরাহ বন্ধ।
-
দক্ষিণ সুদান: মাতৃত্বকালীন সেবায় বড় ধরনের ঘাটতি।
-
কঙ্গো: ১ লাখ রেপ-কিট এবং এইচআইভি নিরোধক ওষুধের অর্ডার বাতিল।
সরকারি অস্বীকৃতি বনাম রূঢ় বাস্তবতা
ইথিওপীয় সরকারের দাবি, দেশটি এখন গমে স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের মতে, “দেশে কেউ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে না।” এমনকি দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্যের বদলে নিজস্ব ‘ইথিওএইড’ গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে সরকার। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হিৎসাতসের সমন্বয়ক আব্রাহা মেব্রাথু জানান, সরকারি এই দাবি কেবল প্রচারণামাত্র। গ্রামের ১ হাজার ৭০০ বাসিন্দার অধিকাংশ এখন মরে যাওয়ার প্রহর গুনছেন। এমনকি মৃত মানুষের হিসাব রাখাও বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সাররা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ সংগ্রহ করতে চাইলেও বাধার মুখে পড়ছেন।
ধুঁকছে জীবন, ফুরিয়ে আসছে কবরের জায়গা
৬৭ বছর বয়সী বিধবা মার্তা তাদেসে জানান, আগে তিনি মার্কিন কর্মসূচির অধীনে এইচআইভি ওষুধ পেতেন, এখন তাও বন্ধ। ওষুধের চেয়েও এখন তার বড় প্রয়োজন এক মুঠো খাবার। স্থানীয় চার্চের ডিকন ইয়োনাস হাগোস আক্ষেপ করে বলেন, “কবরস্থানে নতুন মরদেহ দাফন করার জায়গা পর্যন্ত ফুরিয়ে আসছে।”
উবেতের মতো প্রবীণরা এখন কেবল নিজের পালার অপেক্ষা করছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা আর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মারপ্যাঁচে তাইগ্রের হাজার হাজার মানুষের কাছে জীবন এখন কেবল এক দীর্ঘ যন্ত্রণার নাম।