
ঢাকা, ৭ জানুয়ারি — আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট বক্তারা। তাঁদের মতে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ, সক্ষমতা এবং সদিচ্ছার ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আজ মঙ্গলবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা: ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই ইতিমধ্যে নৈরাজ্য ও বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হলেও সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে এ বিষয়ে কোনো সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, অভিযোগ দাখিল ও ভোট গণনায় স্বচ্ছতা আনার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, নাগরিকেরা দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ চান; তবে গণতন্ত্র ছাড়া নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক হতে পারে। নেপালের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি ও গণতন্ত্র—কোনোটির জন্যই সহায়ক নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করছি। এই সংকট মোকাবিলা না করলে নির্বাচন করা গেলেও প্রকৃত মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, দুর্নীতি ও ঘুষ কমানোর একটি কার্যকর পথ হলো ডিজিটালাইজেশন। শিল্পকারখানায় সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন যতই করা হোক, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
একই সুরে ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান বলেন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হওয়ায় সমাজ ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলিলী বলেন, অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে ডিজিটালাইজেশন অপরিহার্য এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ দিতে হবে।
সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, দেশে প্রায় ৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং সাড়ে ৬ কোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী রয়েছে। এগুলো ইতিবাচক দিক হলেও এর সঙ্গে নানা সমস্যাও বিদ্যমান।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক, ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, সিটি ব্যাংকের অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা তাজমিন নাসরিন ও আবিদা সুলতানা।