
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের জায়গা করে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, প্রযুক্তির গতি এতই তীব্র যে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক নীতিনির্ধারকরা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছেন।
আজ বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) তিন দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে সরকারি কর্মকর্তাদের মেয়াদের বিষয়ে একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বলেন, "সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক নয়, কারণ তাদের মন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আটকে যায়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতি ১০ বছর পরপর নতুন করে ঢেলে সাজানো উচিত।" তিনি আরও যোগ করেন, প্রযুক্তির কাজ হলো পুরোনোকে ভেঙে ফেলা, আর সরকারের স্বভাব হলো পুরোনোকে আঁকড়ে ধরা। এই দ্বন্দ্বে আগামীর স্বার্থে প্রযুক্তিকেই জয়ী হতে হবে।
ডিজিটালাইজেশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. ইউনূস অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "ডিজিটালাইজেশন মানে শুধু দপ্তরে কম্পিউটার বসানো নয়। নাগরিককে যখন সরকারি দপ্তরে আসতে হয়, তখনই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। প্রযুক্তি এমন হতে হবে যেন সরকারি সেবা নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, নাগরিককে সরকারের কাছে আসতে না হয়।"
তরুণদের উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মানুষের জন্ম সৃজনশীল জীব হিসেবে, 'দাস' হিসেবে নয়। তিনি চাকরিকে 'দাসপ্রথা'র সঙ্গে তুলনা করে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "সরকারের কাছে টাকা বা জমি না চেয়ে নীতি ঠিক করে দেওয়ার দাবি জানান। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্থকতা পরিমাপ করা হবে প্রতি বছর কত শতাংশ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হলো তার ভিত্তিতে।"
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ করা স্বৈরাচারী সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিল। দেশের সব প্রান্তে সমান ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের স্কুলগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
পাশাপাশি, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "বাংলাদেশ জাল সার্টিফিকেট বা পাসপোর্টের কারখানা হতে পারে না। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের এই কলঙ্ক মুছে ফেলতে হবে।"
এদিন বক্তব্যের শুরুতে ড. ইউনূস উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে রসিকতা করে বলেন, "প্রধান উপদেষ্টা ব্যস্ত, তাই ৩৩২ নম্বর এআই-কে (AI) পাঠিয়েছেন।" কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব বোঝাতে তাঁর এই অভিনব সূচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রযুক্তিবিদ ও তরুণ উদ্ভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের উপদেষ্টা, দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং কয়েক হাজার তরুণ উদ্ভাবক উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনীটি আগামী শুক্রবার পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।