
সুনির্মল সেন | বিশেষ ফিচার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য বীরত্বগাথা মিশে আছে। কিন্তু একজন বিদেশি নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের টানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন যিনি, তিনি হলেন উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড। একমাত্র বিদেশি হিসেবে তাকে বাংলাদেশের বীরত্বসূচক 'বীর প্রতীক' খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে (উল্লেখ্য: তথ্যে বীর উত্তম থাকলেও সরকারি গেজেট অনুযায়ী তিনি বীর প্রতীক)।
১৯৭১ সালে ওডারল্যান্ড ছিলেন ঢাকার টঙ্গীর বাটা সু কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পেশায় করপোরেট ব্যক্তিত্ব হলেও তার রক্তে ছিল যোদ্ধার তেজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের হয়ে নাৎসিদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল তার। ২৫শে মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন ওডারল্যান্ডের ভেতরে সেই পুরনো যোদ্ধা জেগে ওঠে।
যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল পোশাক ও জুতা। ওডারল্যান্ড নিজ উদ্যোগে বাটা কোম্পানির ৩০ হাজার জোড়া জুতা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরবরাহ করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি তার ফ্যাক্টরির ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, অর্থ এবং শীতের পোশাকের ব্যবস্থা করেছিলেন।
বাটা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে ওডারল্যান্ডের ছিল উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে অবাধ মেলামেশার সুযোগ। তিনি এই সুযোগকে ব্যবহার করেন অত্যন্ত কৌশলে:
তিনি পাকিস্তানি মেসগুলোতে যাতায়াত করে তাদের সামরিক পরিকল্পনার গোপন তথ্য সংগ্রহ করতেন।
সেই অতি গোপনীয় তথ্যগুলো তিনি ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
পাক বাহিনীর বর্বরতার ছবি তুলে তা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়ে বিশ্ববিবেকের কাছে তুলে ধরতেন।
ওডারল্যান্ড শুধু তথ্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি টঙ্গী ও আশেপাশের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন। তার নির্দেশনায় ঢাকায় বেশ কয়েকটি দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশন পরিচালিত হয়। একজন শ্বেতাঙ্গ হয়েও তিনি নিজের পরিচয় আড়াল করে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র চালনা ও কৌশল শিখিয়েছেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি বাটা সু কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরই সরকার তাকে তার অসামান্য অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে। পরবর্তীতে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান। ২০০১ সালের ১৮ই মে ৮৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে এই মহানায়ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শেষ কথা: বাংলাদেশের মানচিত্রের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে ওডারল্যান্ডের মতো অকৃত্রিম বন্ধুদের রক্ত ও ঘাম। যখনই একাত্তরের বীরত্বগাথা উচ্চারিত হবে, গভীর শ্রদ্ধায় স্মরিত হবে অস্ট্রেলিয়ান এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম।