সুনির্মল সেন | বিশেষ কলাম
সিলেট: হাওর অঞ্চলের রাজনীতিতে কিছু নাম কেবল ব্যক্তির পরিচয় নয়, বরং একটি জনপদের ইতিহাসের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তেমনই এক নাম নাছির চৌধুরী। আত্মপ্রচারবিমুখ এই নেতার রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপ্তি ও গভীরতা কজনই বা জানে? বর্তমানের গ্ল্যামার-নির্ভর রাজনীতির যুগেও তিনি একজন ঋজু এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষ।
ছাত্র রাজনীতি থেকে জননেতা
নাছির চৌধুরীর রাজনীতির পাঠ শুরু হয়েছিল ছাত্রাবস্থায়। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদে ভিপি নির্বাচিত হয়ে তিনি নিজের নেতৃত্বের জানান দিয়েছিলেন। সেই কচ্ছপগতির অবিচল পথচলাই তাকে নিয়ে গেছে দিরাই উপজেলার প্রতিটি মানুষের দুয়ারে। পর্যায়ক্রমে তিনি দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিজেকে পরিণত করেছেন হাওরবাসীর আস্থার প্রতীকে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ৯৬-এর সেই ঐতিহাসিক জয়
১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল নাছির চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। সেই নির্বাচনে সংবিধান প্রণেতা ও বর্ষীয়ান জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে পরাজিত করে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে তার অভিষেক ছিল রাজকীয়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের পর যদি দিরাই-শাল্লার রাজনীতিতে কাউকে সমকক্ষ ভাবা হয়, তবে তিনি নাছির চৌধুরী।
হাওরবাসীর ব্র্যান্ড ও প্রতিচ্ছবি
দিরাই, শাল্লা ও আজমিরীগঞ্জসহ গোটা হাওর অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে তিনি সর্বদাই অগ্রণী। জনমানুষের নেতা যখন রাজপথ দিয়ে হাঁটেন, তখন শত শত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার অনুসারী হয়। গরীব-দুঃখী ও মেহনতী মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন নেতা নন, বরং একজন পরম নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।
তৃণমূলের রাজনীতিতে তার যে অর্জন, তা বর্তমান প্রজন্মের অনেক নেতার কাছেই অকল্পনীয়। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার দেশপ্রেম এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম তাকে একটি ‘ব্র্যান্ড’-এ পরিণত করেছে।
২০২৬-এর নির্বাচনে বীরোচিত প্রত্যাবর্তন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই বয়সেও অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন তিনি। দিরাই-শাল্লার মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে সর্বোচ্চ প্রতিদান দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এই জয় কেবল নাছির চৌধুরীর ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি বিএনপি এবং ওই অঞ্চলের গণমানুষের ভালোবাসার প্রতিফলন।
উপসংহার: হাওর অঞ্চলের রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, নাছির চৌধুরী কিংবা ফজলুর রহমানদের মতো নেতাদের বিকল্প তৈরি হওয়া কঠিন। ইতিহাস বলে, গণমানুষের হৃদয়ে যারা জায়গা করে নেন, তাদের সমাপ্তি টানা সম্ভব নয়। নাছির চৌধুরী বেঁচে আছেন এবং থাকবেন দিরাই-শাল্লাবাসীর স্পন্দনে। জয়তু নাছির চৌধুরী!