
বিশেষ প্রতিবেদন | আন্তর্জাতিক
এডওয়ার্ড স্নোডেন বা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের নাম আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, পারমাণবিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘হুইসেলব্লোয়ার’ মর্দেকাই ভানুনু আজও অনেকের কাছে অচেনা। ১৯৮৬ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইসরায়েলের দিমোনা পরমাণু কেন্দ্রের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে তিনি বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর বদলে তাঁকে দিতে হয়েছে এক চরম ব্যক্তিগত মূল্য।
মরক্কোতে জন্ম নেওয়া ভানুনু ১৯৬৩ সালে ইসরায়েলে আসেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে ফার্স্ট সার্জেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৬ সালে তিনি ‘নেগেভ পরমাণু প্রকল্প’ বা দিমোনা কেন্দ্রে টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন। সেখানে কাজ করার সময়ই তিনি উপলব্ধি করেন, ইসরায়েল গোপনে বিশাল এক পারমাণবিক শক্তি গড়ে তুলছে।
১৯৮৫ সালে চাকরি হারানোর পর তিনি লন্ডনের ‘দ্য সানডে টাইমস’-এর কাছে দিমোনা কেন্দ্রের গোপন নথিপত্র ও ছবি তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
ইসরায়েলের কাছে ১০০ থেকে ২০০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
তারা পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী 'থার্মোনিউক্লিয়ার' ডিভাইস তৈরিতে সক্ষম।
পারমাণবিক ইস্যুতে ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে গোপন সহযোগিতা রয়েছে।
লন্ডনে প্রতিবেদনটি প্রকাশের অপেক্ষায় থাকার সময় ভানুনু মানসিক চাপে ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ‘সিন্ডি’ ছদ্মনামের এক মোসাদ এজেন্ট নারীর ফাঁদে পা দেন তিনি। প্রেমের অভিনয়ে ভুলিয়ে তাঁকে ইতালিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে ড্রাগ দিয়ে অচেতন করে অপহরণ করে গোপনে ইসরায়েলে নিয়ে আসা হয়।
১৯৮৮ সালে গুপ্তচরবৃত্তি ও দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ভানুনুকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে টানা ১১ বছর তিনি কাটিয়েছেন মাত্র ৩ মিটার বাই ২ মিটার আয়তনের এক অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে। ২০০৪ সালে তিনি মুক্তি পেলেও তাঁর ওপর চাপানো হয় কঠোর বিধিনিষেধ:
বিনা অনুমতিতে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ।
দেশত্যাগের ওপর আজীবন নিষেধাজ্ঞা।
এমনকি আগে প্রকাশিত তথ্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ নেই।
ভানুনুর তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত যে ইসরায়েলের কাছে অন্তত ৮০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তবে ইসরায়েল আজও তাদের ‘নিউক্লিয়ার অপাসিটি’ বা অস্পষ্টতা নীতি বজায় রেখেছে—অর্থাৎ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করে না, আবার অস্বীকারও করে না।
“আমি কোনো দেশদ্রোহী নই। আমি চেয়েছিলাম বিশ্ব জানুক ইসরায়েল গোপনে কী ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র তৈরি করছে।” — মর্দেকাই ভানুনু (কারাগার থেকে মুক্তির পর)
স্নোডেন বা অ্যাসাঞ্জরা যখন আধুনিক ডিজিটাল যুগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, মর্দেকাই ভানুনু তখনো ইসরায়েলের মাটিতে এক প্রকার ‘বন্দি’ জীবন কাটাচ্ছেন। ইতিহাসের এই সাহসী টেকনিশিয়ান সত্যের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা আজও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের এক অনন্য উদাহরণ।