সবাই আজ প্যারোল না পাওয়ার ঘটনায় আবেগে ফেটে পড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে রাষ্ট্রব্যবস্থা একজন ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রীকে শিশু-সন্তান সহ আত্মহননের পথে ঠেলে দিলো, সেই অপরাধের বিচার কোথায়? কোনটা বেশি অমানবিক—তিন ঘণ্টার প্যারোল না দেওয়া, নাকি পরিকল্পিত হয়রানি, অর্থনৈতিক নিপীড়ন ও আইনি সন্ত্রাসের মাধ্যমে একটি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া? ফেসবুকের ভাষ্য দেখলে মনে হয়—মৃত্যু স্বাভাবিক, বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাবাস গ্রহণযোগ্য; অপরাধ শুধু এটুকু যে কাউকে সাময়িক প্যারোল দেওয়া হয়নি। এই উল্টো নৈতিকতা জাতিকে কোন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো Right to Fair Trial। আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন, রিবাটাল এবং জামিন—এসব কোনো দয়া নয়, সাংবিধানিক অধিকার। জামিন মানে খালাস নয়।
খুবই ব্যতিক্রমী ও গুরুতর প্রাইমা-ফেসি অপরাধ ছাড়া জামিন অস্বীকার করা যায় না। আর জামিন অস্বীকার করলেও কাউকে অনির্দিষ্টকাল বিনা বিচারে আটক রাখা আইনবিরোধী। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? আইনের অধ্যাপক পরিচয়ে আসিফ নজরুল বারবার বিচারকদের জামিন দেওয়ার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করেছেন—চিঠি, বক্তব্য, চাপ। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রকাশ্যে বলেছেন, আওয়ামী লীগ কর্মীদের (নিরপরাধ হলেও) জামিন দেওয়া যাবে না। প্রধান উপদেষ্টা সেই অবস্থানে সম্মতি দিয়েছেন। এই সমন্বিত রাষ্ট্রীয় অবস্থানই এক নারী ও শিশুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। মনে রাখা দরকার—পেনাল কোড অনুযায়ী কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা একটি কগনিজেবল অপরাধ।
স্থানীয় আইনজীবীদের বর্ণনা আরও ভয়াবহ। তথাকথিত ‘হরেদরে’ মামলায় জামিনের আভাস মিললেও জামাতপন্থী পিপি ও তাদের সহযোগীরা আদালত কক্ষেই হট্টগোল, বিচারককে হুমকি, গোপন শালিসে বাধ্য করে। জামিন চাইতে গিয়ে একজন নারীকে ২০–৩০ লাখ টাকার দর কষাকষির মুখে পড়তে হয়। জামিন আদেশ জারি হলেও কারাগার গেটেই পুনরায় গ্রেপ্তার—সবই অর্থ না দিলে। এ কি বিচার, নাকি সংগঠিত চাঁদাবাজি? এই অবিচার টানা দেড় বছর ধরে চলতে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস। এর দায় এড়ানো যাবে না। আমি নিজে সাক্ষী—ফেনীর এক ৬৫ বছর বয়সী মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি বানিয়ে, বাদী–আইও–বিচারক—তিনজনই একই রাজনৈতিক ঘরানার—তবু জামিন অস্বীকার। হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় থেকেও না। অবশেষে উপরের স্তরে যোগাযোগ না করলে জামিন মিলত না। এটাই কি আইনের শাসন? প্রাণী হিসেবে শূকর শান্ত ও উপকারী। কিন্তু মানুষ শূকর যখন রাষ্ট্র চালায়, তখন আইন থাকে—ন্যায় থাকে না। সেই নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত মূল্য জীবন দিয়ে দিয়েছেন একজন মা ও তার শিশুসন্তান। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও আইনি সন্ত্রাসের ফল। এই বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদই আজ ন্যূনতম নৈতিক দায়িত্ব।