তেহরান/লন্ডন/ওয়াশিংটন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় যুক্তরাজ্য তাদের তেহরান দূতাবাস থেকে সাময়িকভাবে কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বের একাধিক দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ইরানের রাজধানীতে তাদের দূতাবাস বর্তমানে দূরবর্তী বা রিমোট পদ্ধতিতে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
মার্কিন দূতাবাসের পদক্ষেপ ও সতর্কতা: ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস শুক্রবার জরুরি নয় এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারকে দেশ ত্যাগের অনুমতি দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, যারা চলে যেতে চান তারা যেন ‘আজই’ সেই ব্যবস্থা করেন। ইমেইলে হাকাবি কর্মীদের প্যানিক বা আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু থাকতেই যেন প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা সেরে নেওয়া হয়।
এর কয়েক দিন আগেই নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে লেবাননের বৈরুত দূতাবাস থেকে জরুরি নয় এমন সব কর্মীকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সতর্কবার্তা: উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে চীন, ভারত ও কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের অতি দ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আসন্ন সফর ও সামরিক উপস্থিতি: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েল সফরে যাবেন এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। ইরানের পরমাণু ইস্যুসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক অগ্রাধিকার নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সন্দেহ, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে। তবে তেহরান বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এবারই মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প যাকে একটি ‘আর্মাডা’ বা বিশাল নৌবহর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ, ফাইটার জেট এবং রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেছিলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই বিশ্ব জানতে পারবে চুক্তি হচ্ছে নাকি সামরিক পদক্ষেপ।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অগ্রগতি: এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওমান জানিয়েছে, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে এবং খুব দ্রুতই পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ইরানও এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, সামরিক হামলার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই কূটনৈতিক সমাধানই পছন্দ করি, তবে সবকিছু নির্ভর করছে ইরানিদের পদক্ষেপ ও বক্তব্যের ওপর।’
সারসংক্ষেপ: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় যুক্তরাজ্য তাদের তেহরান দূতাবাস থেকে কর্মী সরালেও রিমোট পদ্ধতিতে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইসরায়েল ও বৈরুত দূতাবাস থেকে জরুরি নয় এমন কর্মী সরাচ্ছে। চীন, ভারত, কানাডাও নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইসরায়েল সফরে যাচ্ছেন, এবং যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে চুক্তি না হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও জেনেভায় পরোক্ষ আলোচনায় ওমান অগ্রগতির কথা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পরিস্থিতির দিকে বিশ্ববাসী সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।