
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | লন্ডন |
লন্ডনের রাস্তায় হাতে ফোন নিয়ে হাঁটছেন? সাবধান! চোখের পলকে তা হারিয়ে যেতে পারে। হঠাৎ ঝড়ের গতিতে একটি ইলেকট্রিক বাইক এসে আপনার হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে উধাও—এমন ঘটনা এখন লন্ডনের রাস্তায় প্রায় নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লন্ডনে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১১টি ফোন চুরি হয়েছে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। প্রতিদিন শত শত ছিনতাই ঘটছে শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে।
কেমব্রিজের বাসিন্দা ফেনেলা রলিংস গত আগস্টে এক মার্কেটে কেনাকাটার সময় নিজের নতুন আইফোন–১৬ ছিনতাইয়ের শিকার হন। ফোনটিতে ছিল তাঁর ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের সঙ্গে তোলা অসংখ্য ছবি ও ভিডিও।
ফেনেলা বলেন,
“এই স্মৃতিগুলো আমি আর কোনো দিন ফিরে পাব না।”
‘ফাইন্ড মাই (Find My)’ অ্যাপে তিনি দেখতে পান, তাঁর ফোনটি প্রথমে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই দুবাই ও চীনে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে তাঁকে একাধিক ফিশিং মেসেজ পাঠানো হয়—অ্যাকাউন্টের তথ্য বা সিকিউরিটি আনলক করতে প্রলুব্ধ করা হয়।
লন্ডনের রাস্তায় এখন সক্রিয় রয়েছে সংগঠিত কয়েকটি অপরাধ চক্র। একটি স্মার্টফোন বিক্রি করেই তারা পাচ্ছে প্রায় ৪০০ পাউন্ড পর্যন্ত।
গত বছর সনি স্ট্রিঙ্গার নামের এক ছিনতাইকারীকে মাত্র এক ঘণ্টায় ২৪টি ফোন চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে আদালত তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।
লন্ডন ট্যাক্সি ড্রাইভারস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান পল ব্রেনান বলেন,
“লন্ডন এখন ফোন চোরদের জন্য সোনার খনি। চোরেরা সাধারণত ইলেকট্রিক বাইকে করে আসে, মুখ ঢেকে বা হুডি পরে থাকে। পুলিশও অনেক সময় তাদের ধরতে পারে না।”
অপরাধ ঠেকাতে লন্ডন পুলিশ এখন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাইক ব্যবহার শুরু করেছে।
পুলিশ সার্জেন্ট রায়ান পেরি বলেন,
“চোরেরা যখন দেখে আমরাও একই ধরনের বাইকে টহল দিচ্ছি, তখন তারা ভয় পায়। আমরা প্রস্তুত—ধরব, আর আদালতে পাঠাব।”
শুধু রাস্তায় নয়, আকাশ থেকেও এখন নজরদারি চলছে।
ন্যাশনাল পুলিশ এয়ার সার্ভিসের (এনপিএএস) ট্যাকটিক্যাল ফ্লাইট অফিসার অ্যান্ড্রু ল-লেস জানান,
“আমরাই ফোন চোরদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। আকাশে আমাদের হেলিকপ্টার উঠলেই তারা পালায়।”
এনপিএএস বেস ম্যানেজার সার্জেন্ট গ্লেন ওয়াকার বলেন, হেলিকপ্টারের ক্যামেরা এমন ক্ষমতাসম্পন্ন যে ১ হাজার ফুট ওপরে থেকেও সন্দেহভাজনের মুখ শনাক্ত করা যায়।
শুধু পুলিশ নয়, স্থানীয় নাগরিকেরাও এখন চোরদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন।
ডিয়েগো গালডিনো, এক ডেলিভারি ম্যান, নিজেকে বলেন “পিকপকেট হান্টার।”
তিনি রাস্তায় চুরি হতে দেখলে ভিডিও করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। তাঁর অ্যাকাউন্ট ‘PickPocketLondon’ ইতিমধ্যে লাখ লাখ ভিউ পেয়েছে।
ডিয়েগো বলেন,
“তারা দল বেঁধে আসে, সব সময় মুখ ঢেকে রাখে। আমি যখনই দেখি কেউ চুরি করছে, চিৎকার করে মানুষকে সতর্ক করি।”
ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের (বিটিপি) তথ্য অনুযায়ী, অনেক চোর প্রতিদিন ট্রেনে করে লন্ডনে আসে, চুরি করে আবার ফিরে যায়।
ফিন্সবেরি পার্ক স্টেশনের এক অফিসার বলেন,
“ওই কালো টুপি পরা লোকটিকে দেখছেন? সে পোর্টসমাউথে থাকে। প্রতিদিন ট্রেনে আসে, ফোন চুরি করে ফিরে যায়—এটাই তার ফুলটাইম কাজ।”
বিটিপির আরেক কর্মকর্তা বলেন,
“এখন অনেকেই চুরি করাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছে। কেউ কেউ আবার বিদেশ থেকে এসে কয়েক সপ্তাহ চুরি করে ফিরে যায়।”
📱 বিশ্লেষকরা বলছেন, লন্ডনের স্মার্টফোন নির্ভরতা, পর্যটক সংখ্যা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা—সব মিলিয়ে এই অপরাধ চক্রের জন্য শহরটি এখন এক ‘ডিজিটাল শিকারভূমি’।