
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, সহকারী শিক্ষক অভিযুক্ত
কোম্পানীগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৫ নম্বর উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের বতুমারা নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোহেল আহমদ (প্রয়াত সামছুল ইসলামের ছেলে, লামাগ্রাম) দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আত্মসাৎ করে আসছেন। ভুক্তভোগী অভিভাবকদের দাবি, তিনি শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের পিন পরিবর্তন করে সহজ-সরল অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করে টাকা তুলে নিতেন।
ভুক্তভোগী অভিভাবকদের ভাষ্য, গত ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মণি আক্তার (৬) ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মীম আক্তারের উপবৃত্তির টাকা অভিযুক্ত শিক্ষক মোবাইল থেকে ট্রান্সফার করে নেন। পরে তিনি অভিভাবকদের জানান, পরবর্তী মাসে উপবৃত্তির টাকা আসবে। এতে সন্দেহ হলে শিক্ষার্থীদের অভিভাবক বিদ্যালয়সংলগ্ন 'মেসার্স বিশাল ফার্মেসি'র মালিক ও পল্লী চিকিৎসক বিনোদ সরকারের শরণাপন্ন হন। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করে তিনি দেখতে পান, টাকাগুলো আগেই অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।
বিনোদ সরকার দাবি করেন, এর আগেও একই কৌশলে একাধিক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তাঁর কাছে এসেছে। বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুরব্বিদেরও জানানো হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিক্ষক সোহেল আহমদ অতীতেও তাঁর স্ত্রীর মোবাইল নম্বরে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা পাঠিয়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান জানান, গত ৭ জুলাই এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাঁর দোকানে টাকা উত্তোলনের জন্য গেলে স্টেটমেন্টে দেখা যায়, উপবৃত্তির টাকা অন্য একটি নম্বরে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। পরে অভিভাবক জানতে পারেন, সেটি অভিযুক্ত শিক্ষকের স্ত্রীর নম্বর।
দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী উসমান গণির অভিভাবক রোজিনা বেগম অভিযোগ করেন, শিক্ষক সোহেল তাঁর উপবৃত্তির টাকার একটি অংশ রেখে দেন এবং বিষয়টি নিয়ে কাউকে জানালে মামলার ভয়ভীতি দেখান।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক সোহেল আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের দায় স্বীকার করেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, তাঁর আত্মীয় লোকমানের দুই মেয়ে মণি আক্তার ও মীম আক্তারের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তিনি বলেন, "যদি একজন শিক্ষক এমন কাজ করেন, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কী হবে?"
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সনজিতা সিনহা বলেন, বিষয়টি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেসব শিক্ষার্থীর টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরও বলেন, আত্মসাতের ঘটনাটি সত্য এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সাফিয়া, আশিক মিয়া ও তাজিল মিয়ার পরিবারের নাম রয়েছে।
৫ নম্বর উত্তর রণিখাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়। তিনি দাবি করেন, উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের ঘটনাটি সত্য।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা টিটু কুমার দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভিডিও বক্তব্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ সময় শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত উপজেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চাটিবহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজমল আলী, যিনি অভিযুক্ত শিক্ষকের মামা বলে জানা গেছে, সংবাদকর্মীদের ভিডিও ধারণ করেন এবং সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়ার অভিযোগে কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।