
শ্বশুর-শালার নামে সম্পদের পাহাড়, বালুচরে রাজপ্রাসাদ; সিসিকের রাকুর অবৈধ সম্পদের খোঁজে কবে নামবে দুদক?
সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) একের পর এক মেয়র বদল হলেও অদৃশ্য এক জাদুবলে অপরিবর্তিত থেকে যায় কর্মকর্তা অংশুমান ভট্টাচার্য্য রাকুর ভাগ্য।
মৌলভীবাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে স্রেফ একটি ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট সম্বল করে সিলেটে ভাগ্য অন্বেষণে এসেছিলেন এই যুবক। শুরুতে দৈনিক মজুরিভিত্তিক (মাস্টার রোল) সাধারণ ড্রাফটসম্যান হিসেবে সিসিকে কর্মজীবন শুরু করলেও, বর্তমানে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। এমনকি বিপুল অঙ্কের অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অতি সম্প্রতি তিনি ‘নির্বাহী উপ-কৌশলী’ পদও বাগিয়ে নিয়েছেন বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। নগর ভবনে এখন কান পাতলেই শোনা যায় দুর্নীতি, জালিয়াতি আর “ম্যানেজ বাণিজ্যের” এই বরপুত্রের আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিসিকের সাবেক বিতর্কিত সহকারী প্রকৌশলী অরবিন্দ দেবের হাত ধরেই দুর্নীতি ও পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ করার দীক্ষা নেন রাকু। অরবিন্দ দেব যেভাবে বাতি পরিদর্শক থেকে রাতারাতি সহকারী প্রকৌশলী হয়েছিলেন, রাকুও ঠিক একই ছক অনুসরণ করেন। সিসিকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানকে ম্যানেজ করে ড্রাফটসম্যান থেকে প্রথমে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেন তিনি। এরপর অরবিন্দ দেবের ছত্রছায়ায় শুরু হয় তার আসল সিন্ডিকেট বাণিজ্য। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলন (এস্টিমেট) দুই থেকে তিন গুণ বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। অরবিন্দ দেব বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী হলেও তার রেখে যাওয়া দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য এখন একাই নিয়ন্ত্রণ করছেন রাকু।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ ফাঁকি দিতে অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন রাকু। তার অবৈধ আয়ের সিংহভাগ সম্পত্তিই গড়ে তুলেছেন শ্বশুর, শালা ও সম্বন্ধীদের নামে। অতীতে নগরীর চালিবন্দর মাদানী সিটিতে শ্বশুরের নামে কেনা জমিতে বসবাস করলেও, বর্তমানে নিজের রূপ বদলেছেন। নগরীর বালুচর দুর্গাবাড়ি এলাকায় গড়ে তুলেছেন চোখধাঁধানো এক বিশাল ‘রাজপ্রাসাদ’। এছাড়া নগরীর করের পাড়াসহ বিভিন্ন অভিজাত ও বাণিজ্যিক এলাকায় তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে।
গ্রামের বাড়িতে রাজকীয় ঠাট ও সপরিবারে বিলাসী জীবন
একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থার এই কর্মকর্তা এখন নিজ জেলা মৌলভীবাজারে নিয়মিত আয়োজন করেন রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান। নিজেকে সিসিকের সাধারণ কর্মী দেখানোর জন্য নিজে দাপ্তরিক মোটরসাইকেল ব্যবহার করলেও, স্ত্রী ও সন্তানদের চলাচলের জন্য কিনে দিয়েছেন কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি। সেই দামি গাড়িতে চড়েই তার পরিবার বিভিন্ন স্কুল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এছাড়া প্রতি বছর অন্তত দুটি ঈদে সপরিবারে বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ করা তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
মেয়র বদলালেও অক্ষত ক্ষমতার উৎস
সিসিকের ক্ষমতার চেয়ারে যখনই যে দল বা মেয়রের আগমন ঘটেছে, রাকু তার বিশেষ ‘ম্যানেজ’ ক্ষমতা দিয়ে সবাইকে পকেটস্থ করে নিয়েছেন। সাবেক মেয়র মরহুম বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের আমলে সিসিকে প্রবেশ করলেও, পরবর্তী প্রতিটি মেয়রের বোর্ডেই তিনি সমান প্রভাবশালী ও অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন সময়ে তার কোটি কোটি টাকার জাল-জালিয়াতির ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়লেও, প্রতিবারই বিপুল অর্থের বিনিময়ে তা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন এই কর্মকর্তা।
মাস্টার রোলের একজন সাধারণ কর্মচারীর এমন উল্কাবেগে শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার ঘটনায় সিলেট নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই মহোৎসবের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এবং সিসিক কর্তৃপক্ষের একটি উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি।