লাইফস্টাইল ডেস্ক | ১৩ মার্চ, ২০২৬
দীর্ঘ ২০-২৫ বছরের দাম্পত্য। সন্তানকে মানুষ করতেই কেটে গেছে জীবনের সোনালি সময়। কিন্তু সেই সন্তান যখন পড়াশোনা বা কাজের প্রয়োজনে ঘর ছাড়ে, তখন অনেক দম্পতি নিজেদের আবিষ্কার করেন এক অদ্ভুত শূন্যতায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এম্পটি নেস্ট’ (Empty Nest) বা খালি বাসা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এই সময়েই বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘এম্পটি নেস্ট ডিভোর্স’।
কেন বাড়ছে এই বিচ্ছেদ?
সন্তান চলে যাওয়ার পর দম্পতিরা যখন একে অপরের মুখোমুখি বসেন, তখন কিছু চাপা পড়া সত্য সামনে চলে আসে:
-
সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন: অনেকে কেবল সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এতদিন একসঙ্গে ছিলেন। সন্তান চলে যাওয়ার পর তারা বুঝতে পারেন, নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার সেই পুরোনো টানটুকু আর নেই।
-
যোগাযোগের অভাব: দীর্ঘ সময় ধরে কেবল সন্তান বা সংসার নিয়ে আলাপ করতে করতে দম্পতিরা নিজেদের ব্যক্তিগত আবেগীয় আদান-প্রদান হারিয়ে ফেলেন।
-
আগ্রহের ভিন্নতা: মধ্যবয়সে পৌঁছে দেখা যায় স্বামী ও স্ত্রীর শখ, রুচি বা জীবনের লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে।
-
মিডলাইফ ক্রাইসিস: জীবনের অর্ধেকটা পার করার পর নিজের অস্তিত্ব বা অপূর্ণতা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হওয়া।
“খালি বাসার নিঃসঙ্গতা আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি বিচ্ছেদের গল্প নয়, বরং নিজেদের নতুন করে চিনে নেওয়ার সময়। বার্ধক্যকে একসঙ্গে আলিঙ্গন করার শপথ নেওয়ারই দিন এটি।” > — সানজিদা শাহরিয়া, চিকিৎসক ও কাউন্সিলর (ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি)।
সামাজিক ও আর্থিক ঝুঁকি
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই বয়সে বিচ্ছেদ শুধু দম্পতির ওপর নয়, সন্তানদের ওপরও মানসিক ও দায়িত্বের চাপ বাড়ায়।
-
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর প্রভাব: প্রবীণ বাবা-মায়ের অসুস্থতা বা দেখভালের দায়িত্ব তখন প্রবাসে বা দূরে থাকা সন্তানদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
-
আর্থিক চাপ: অবসরের পরিকল্পনা বা চিকিৎসার খরচের ক্ষেত্রে একা হয়ে যাওয়াটা বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ: নতুন শুরুর সুযোগ
বিচ্ছেদই একমাত্র সমাধান নয়। এই ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
-
নতুন করে চেনা: সন্তানহীন ঘরকে শূন্যতা না ভেবে নিজেদের সময় দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখুন। একে অপরের শখ বা আগ্রহে সময় দিন।
-
খোলামেলা আলোচনা: নিজেদের সমস্যা বা অপূর্ণতা নিয়ে সঙ্গীর সাথে সরাসরি কথা বলুন। প্রয়োজনে প্রেশাদার কাউন্সিলরের সাহায্য নিন।
-
ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা: গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ বছর বয়সের পর মানুষ যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে তরুণদের চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল ও অভিজ্ঞ হয়। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্ক মেরামত করা সম্ভব।
-
বিয়ের নতুন সংজ্ঞা: সমাজ কী ভাববে তার চেয়ে বড় কথা আপনারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কীভাবে শান্তিতে থাকতে পারেন, সেই পথ খুঁজে বের করা।
পরিশেষে: ভালোবাসা মানে কেবল সন্তান লালন-পালন নয়; বরং জীবনের শেষ প্রান্তে একে অপরের সহযাত্রী হয়ে বার্ধক্যকে হাসিমুখে বরণ করে নেওয়া।