সম্পত্তির লোভে সৎ ভাইকে ‘জাদুটোনা করে পাগল’ বানানোর অভিযোগ, ঘরবাড়ি বিক্রি করে উধাও পিতা৷
সুস্থ ছেলেকে ‘পাগল’ বানিয়ে কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রি করে উধাও পিতা-সৎ ভাই সহ পরিবার!
কোটি টাকার সম্পত্তি ও সৎ ভাইকে ‘পাগল’ বানানোর নির্মম গল্প!
নিজস্ব সংবাদদাতা : কয়েক কোটি টাকার পৈতৃক সম্পত্তি একাই ভোগ করতে প্রথম পক্ষের সন্তানদের বঞ্চিত করার এক অভিনব ও অমানবিক অভিযোগ উঠেছে সিলেটের সদর উপজেলায়। প্রথম পক্ষের তিন সন্তানকে কোনো কিছু না জানিয়ে বসতভিটাসহ স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রি করে, দ্বিতীয় পক্ষের সন্তানদের নিয়ে আত্মগোপনে গেছেন বাবা। এমনকি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে প্রথম পক্ষের এক সন্তানকে ‘জাদুটোনা করে পাগল’ বানিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে সিলেট সদর উপজেলার ৭ নং মোগলগাঁও ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের লামা আকিলপুর গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লামা আকিলপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল লেইছ (৫৫) দুই বিয়ে করেন। প্রথম সংসারে তাঁর তিন সন্তান রয়েছে। পরবর্তীতে প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে আল-আমিন (২৫) সহ দুই সন্তানের জন্ম হয়।
অভিযোগ উঠেছে, গত কিছুদিন আগে প্রথম পক্ষের তিন সন্তানকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ২য় বিয়ের স্ত্রী ও সন্তান আল আমিন'র কুপরামর্শে আবুল লেইছ তাঁর কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও বসতভিটা বিক্রি করে দেন। বিক্রয়লব্ধ সমস্ত টাকা তিনি দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান আল-আমিনের হাতে তুলে দিয়ে সপরিবারে এলাকা ছেড়ে সিলেট শহরে পালিয়ে যান।
প্রথম পক্ষের তিন সন্তানের মধ্যে একজন বর্তমানে গুরুতর মানসিক ভারসাম্যহীন। তবে এলাকাবাসীর দাবি, এই ছেলেটি আগে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান:
"আব্দুল মুমিন আগে পাগল ছিল না। কোটি টাকার সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা থেকে তাকে দূরে রাখতে এবং দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে আল-আমিন যাতে একাই সব ভোগ করতে পারে, সেজন্য মুমিনকে জাদুটোনা (কালো জাদু) করে পাগল বানানো হয়েছে। এরপর তড়িঘড়ি করে সব বিক্রি করে তারা উধাও হয়ে গেছে।"
পারিবারিক এই বিরোধে এখন ক্ষুব্ধ পুরো লামা আকিলপুর গ্রাম। প্রতিবেশীদের স্পষ্ট দাবি, পারিবারিক বিষয় যাই হোক না কেন, প্রথম পক্ষের সন্তানদের এভাবে রাস্তায় বসিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। আল-আমিনের মতো আব্দুল মুমিনসহ প্রথম পক্ষের বাকি দুই সন্তানও আবুল লেইছের রক্ত। সম্পত্তি যদি বিক্রিও করা হয়ে থাকে, তবে প্রথম পক্ষের সন্তানদের তাদের ন্যায্য ভাগ দিতে হবে, অন্যথায় মানসিক ভারসাম্যহীন মুমিনসহ সবার আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব পিতাকেই নিতে হবে।
২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আল্লাহর সৃষ্টি ১৮ হাজার মাখলুকাতের প্রতিটা জীবের জন্য রিজিক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা করে দেন। কিন্তু আজ সমাজে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, মনে হচ্ছে অসহায় আব্দুল মুমিনের থাকার বা বেঁচে থাকার কোনো ব্যবস্থাই দুনিয়াতে অবশিষ্ট নেই।"
এই অমানবিক ঘটনার বিষয়ে জালালাবাদ থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হলে প্রশাসন জানায়, বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন এবং দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। সংস্থার প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়েছেন, যদি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম পক্ষের সন্তানদের ন্যায্য অধিকার ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা না করা হয়, তবে সংস্থার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়া হবে এবং আদালতে মামলা দায়ের করা হবে।
অন্যদিকে, এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সিলেট সদর উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অফিশিয়াল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
একদিকে কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রি করে পিতার পলায়ন, অন্যদিকে সুস্থ ছেলেকে 'পাগল' বানানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে লামা আকিলপুর গ্রামের এই ঘটনাটি এখন সিলেটের টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। অসহায় প্রথম পক্ষের সন্তানরা কি তাদের অধিকার ফিরে পাবে, নাকি ধামাচাপা পড়ে যাবে এই নির্মমতা? এখন সেটাই দেখার বিষয়।