৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৪ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

সাকরাইনের আকাশে বিষণ্নতা: উগ্রপন্থার আস্ফালন ও প্রশাসনের কড়াকড়িতে ম্লান ঐতিহ্য

admin
প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারি, বুধবার, ২০২৬ ২১:৫৯:৩২
সাকরাইনের আকাশে বিষণ্নতা: উগ্রপন্থার আস্ফালন ও প্রশাসনের কড়াকড়িতে ম্লান ঐতিহ্য

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | পুরান ঢাকা ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

পুরান ঢাকার আকাশ মানেই পৌষ সংক্রান্তির শেষ বিকেলের রঙিন উৎসব। তবে এবারের সাকরাইনে সেই চিরচেনা জৌলুস আর চোখে পড়েনি। ঘুড়ির রাজত্ব কমে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিয়েছে নিস্তব্ধতা কিংবা উচ্চশব্দের ডিজে পার্টি। শতবর্ষী এই উৎসবের ঐতিহ্যবাহী রূপ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে যেমন প্রবীণদের মাঝে হতাশা রয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উৎসবটির আয়োজন নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক ও প্রকাশ্য বিরোধিতা।

Manual7 Ad Code

ঘুড়ির বদলে ডিজে ও আতশবাজির দাপট

আজ বুধবার সকাল থেকেই পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, লক্ষ্মীবাজার ও সূত্রাপুর এলাকায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আমেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে যেখানে প্রতিটি ছাদ উৎসবে মাতোয়ারা থাকত, এবার সেখানে অধিকাংশ ছাদ ছিল জনশূন্য। শাঁখারীবাজারের প্রবীণ বিক্রেতা জিতু রায় আক্ষেপ করে বলেন, “ক্রেতার উপস্থিতি এবার অনেক কম। সাকরাইনের আগের সেই রমরমা অবস্থা আর নেই।”

অন্যদিকে, সন্ধ্যা নামার পর ঘুড়ি ওড়ানোর চিরায়ত ঐতিহ্যের বদলে দাপট বেড়েছে পটকা ও আতশবাজির। স্থানীয় বাসিন্দা রাফেজা বেগমের মতে, “সাকরাইন মানে এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজে পার্টি। উৎসবের আসল রূপ হারিয়ে যাচ্ছে।”

কট্টরপন্থার আস্ফালন ও লিফলেট বিতরণ

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর এবারের সাকরাইন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। গেন্ডারিয়া, নারিন্দা ও সূত্রাপুর এলাকার কিছু মসজিদ থেকে উৎসবের বিরুদ্ধে মিছিল বের করার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় সাকরাইনকে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী’ দাবি করে লিফলেট বিতরণ ও উসকানিমূলক পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।

Manual8 Ad Code

আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মানস বোস এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই উৎসব বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। উৎসবের নামে যদি কোনো অনিয়ম হয় সেটি বন্ধ করা উচিত, কিন্তু উৎসব বন্ধ করার চেষ্টা সংস্কৃতির ওপর আঘাত।”

Manual6 Ad Code

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের উদ্বেগ

উৎসবের এই সংকটপূর্ণ অবস্থা নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সানজিদা ফারহানা বলেন, “সংস্কৃতি ও উৎসব একটি জাতির পরিচয়। ভিন্ন মত বা ধর্মের উৎসবের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ। সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সবার মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকা প্রয়োজন।”

প্রশাসনের ভূমিকা ও নিরাপত্তা কড়াকড়ি

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এবার পুরান ঢাকা জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘুড়ি ওড়ানোতে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ডিজে গান, ফানুস ও আতশবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোতোয়ালি থানার উপপুলিশ কমিশনার ফজলুল হক বলেন, “রাতে ডিজে পার্টি ও আতশবাজি বন্ধ রাখতে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সার্বক্ষণিক পুলিশ টহল রয়েছে।”

Manual7 Ad Code

একদিকে কট্টরপন্থীদের প্রকাশ্য বিরোধিতা, অন্যদিকে প্রশাসনের বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তার কড়াকড়ি—এই দুইয়ের চাপে পড়ে পুরান ঢাকার শত বছরের প্রাণবন্ত ‘সাকরাইন’ আজ তার নিজস্ব অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।