১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৭শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

সাকরাইন নিষিদ্ধের নেপথ্যে কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? পুরনো ঢাকার আকাশে উৎসবের বদলে নিস্তব্ধতা

admin
প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারি, বুধবার, ২০২৬ ২১:৪১:২১
সাকরাইন নিষিদ্ধের নেপথ্যে কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? পুরনো ঢাকার আকাশে উৎসবের বদলে নিস্তব্ধতা

Manual2 Ad Code

সুনির্মল সেন:

পুরনো ঢাকার আকাশ এবার শীতকালীন চিরচেনা সেই রঙিন রূপে সাজবে না। পৌষ সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসব—যা শাঁখারীবাজার থেকে নবাবপুর পর্যন্ত প্রতিটি ছাদে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করত, সেখানে এবার বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। অভিযোগ উঠেছে, জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব নিষিদ্ধ করেছে। আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের প্রধান সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর চাপ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Manual8 Ad Code

যুক্তির অসারতা ও দ্বিমুখী মানদণ্ড

উৎসব নিষিদ্ধের কারণ হিসেবে পরিবেশ রক্ষা, পাখির মৃত্যু এবং শব্দদূষণের কথা বলা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা এই যুক্তিকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের মতে, ঢাকা শহরে বহুতল ভবনের কাচ, বায়ুদূষণ এবং মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণে প্রতিদিন যত পাখি মারা যাচ্ছে, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। এছাড়া বুড়িগঙ্গায় প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য নিক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়াকে বৈষম্যমূলক মনে করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে শব্দদূষণ নিয়ে। সারা বছর যানবাহনের তীব্র হর্ন, নির্মাণকাজ এবং উচ্চ ক্ষমতার মাইকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা বিভিন্ন ধর্মীয় সভার লাউডস্পিকারের শব্দে যখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন কেবল সাংস্কৃতিক উৎসবের বেলায় এই বিধিমালা কেন—সেই প্রশ্ন এখন জনমনে।

আদর্শিক সংঘাত ও বাঙালির সংস্কৃতি

অভিযোগ উঠেছে, সাকরাইনকে ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, ঘুড়ি ওড়ানো বা পিঠা খাওয়া কোনোভাবেই ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী নয়। অনেকে একে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি ধাঁচের ধর্মরাষ্ট্র চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। জামায়াতে ইসলামীর অতীত ইতিহাস টেনে বলা হচ্ছে, তারা শুরু থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে আসছে এবং এদেশকে নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যার আদলে চালাতে চায়।

Manual2 Ad Code

সরকারের বৈধতা ও অভ্যুত্থান প্রসঙ্গ

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঘটনাপ্রবাহকে অনেক মহলে একটি সুপরিকল্পিত ক্যু বা সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থনে সংগঠিত অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সরকার নির্বাচিত নয় বলে তাদের জনগণের সাংস্কৃতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো ম্যান্ডেট নেই বলেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে ড. ইউনূসের মাইক্রোক্রেডিট ব্যবস্থার নেতিবাচক দিক এবং উচ্চ সুদের হার নিয়ে জনমনে ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে।

অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

পুরনো ঢাকার মিশ্র সংস্কৃতি, যেখানে হিন্দু-মুসলিম যুগ যুগ ধরে একত্রে উৎসব পালন করে আসছে, তা বর্তমানে হুমকির মুখে। সাকরাইন নিষিদ্ধ করাকে কেবল একটি উৎসব বন্ধ নয়, বরং বাঙালির অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে সাধারণ মানুষ মনে করে, জোর করে সংস্কৃতি দমন করা যায় না।

Manual5 Ad Code

শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতি তার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় আবারও কোনো আন্দোলনের পথে হাঁটবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

Manual5 Ad Code