সিলেটে ট্রিপল মার্ডার, আটকৃত আসামীর রহস্যজনক স্বীকারোক্তি, কী বলছে পুলিশ?
তিনজন মানুষকে হত্যার পর সন্দেহভাজন ব্যক্তি পালিয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর শরীরে রক্তের দাগ কোথায়? কাপড়ই বা কোথায়? আর বাড়ির আশপাশের সিসিটিভির বাকি ফুটেজ কোথায়?
সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় একই পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন বাবুল মিয়া। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর চলাফেরা, পোশাক এবং ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-তিনজনকে ছুরি দিয়ে হত্যার পর একজন ব্যক্তি কীভাবে এতটা স্বাভাবিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন?
তিনজন মানুষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার ঘটনায় সাধারণত রক্তের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাহলে সন্দেহভাজন ব্যক্তির শরীর বা পরনের পোশাকে রক্তের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন ছিল কি না-এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
যদি পোশাকে রক্ত লেগেই থাকে এবং পরে তা ধুয়ে বা পরিবর্তন করে ফেলা হয়ে থাকে, তাহলে সেই পোশাক কোথায়? সেটি কি পুলিশ উদ্ধার করেছে? ফরেনসিক পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে? কাপড়ে বা শরীরে নিহতদের রক্তের ডিএনএ পাওয়া গেছে কি না—এসব তথ্যও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে।
মিতালী আবাসিক এলাকাটি সিসিটিভি-নিয়ন্ত্রিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু একই ঘটনায় প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোডশেডিংয়ের কারণে হত্যাকাণ্ডের সময় সিসিটিভিতে কিছু দৃশ্য ধরা পড়েনি।
তাহলে প্রশ্ন হলো,
ঘটনার আগে ও পরে ওই বাড়ির আশপাশের সব সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ কি সংগ্রহ করা হয়েছে?
বাড়ির প্রবেশপথ, বের হওয়ার রাস্তা, আশপাশের ভবন, সড়ক কিংবা মোড়ের ক্যামেরায় কি সন্দেহভাজন ব্যক্তির চলাচলের সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে?
তিনি কখন বাসায় ঢুকলেন, কখন বের হলেন, তাঁর হাতে বা শরীরে কী ছিল, পোশাকে কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি না-এসব ফুটেজ কি তদন্তকারীরা ধারাবাহিকভাবে মিলিয়ে দেখেছেন?
কারণ শুধু একটি ক্যামেরার একটি দৃশ্য দিয়ে একটি ট্রিপল মার্ডারের পুরো ঘটনাক্রম নিশ্চিত করা কঠিন। ঘটনার আগে থেকে পরে পর্যন্ত ‘টাইমলাইন’ পরিষ্কার হওয়া দরকার।
আরও একটি প্রশ্ন, যদি হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন ব্যক্তি দ্রুত পালিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর হাতে থাকা সম্ভাব্য অস্ত্র কোথায় গেল? পোশাক পরিবর্তন বা পরিষ্কার করার কোনো প্রমাণ আছে কি? আশপাশে এমন কোনো স্থান পাওয়া গেছে কি, যেখানে রক্তমাখা পোশাক বা আলামত ফেলার সুযোগ ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই মিলবে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠা মানেই পুলিশের তদন্ত ভুল-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। একইভাবে শুধু গ্রেপ্তার ও পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো ঘটনাকে চূড়ান্তভাবে মেনে নেওয়াও উচিত নয়।
একটি ট্রিপল মার্ডারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন দৃশ্যমান প্রমাণ, ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ পরীক্ষা, সিসিটিভির পূর্ণাঙ্গ ফুটেজ এবং ঘটনার মিনিটভিত্তিক টাইমলাইন।
সিলেটবাসীর এখন তাই একটাই প্রত্যাশা:
তিনটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য যেন কোনো অনুমান বা একপক্ষের বক্তব্যে থেমে না যায়। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রমাণসহ সামনে আসুক।
কারণ প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনাটি কি সত্যিই পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনার মতোই ঘটেছে, নাকি এর আড়ালে আরও কোনো অজানা তথ্য রয়েছে?
এই উত্তরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।