উজ ডেক্স
সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রাথমিকভাবে প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিককে মনোনয়ন দিয়েছে। কাগজপত্র হাতে পেলেও তিনি এখনো এই আসনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের এক প্ল্যাটফর্মে আনতে পারেননি। হাতছাড়া মাঠ ফিরিয়ে আনতে তিনি বিভিন্ন উপজেলায় ছুটছেন। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেকেই এখনো তাকে নিয়ে দ্বিধায় আছেন। চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকায় মালিকের নাম থাকবে কি না-সে নিয়েও সন্দেহ কাটেনি। ফলে প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও মাঠের রাজনীতি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। বরং সালাম ও কাইয়ুম অনুসারীরা ‘রিভিউ’র দাবিতে আরও সংগঠিত হয়ে উঠেছেন।
বিএনপির হাইকমান্ডের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সিলেটের আসনগুলোতে চূড়ান্ত মনোনয়ন ২৫ থেকে ২৭ নভেম্বরের মধ্যে ঠিক হবে। যিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাবেন, তিনিই হবেন ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী-এরপর আর কোনোরকম পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না। তখন ব্যক্তিগত বলয়, গ্রুপিং বা ভিন্নমত ভুলে সবাইকে তারেক রহমান ও ধানের শীষের পক্ষে মাঠে থাকতে হবে। তাই আগামির এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত সিলেট-৩-এ মালিকের হাতে থাকা প্রাথমিক মনোনয়নও তাকে পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রণ দিতে পারেনি। অন্য দুই বলয়ের সমর্থকরা এখনো তাকে ঘিরে সিদ্ধান্তহীনতায়।
দলীয় আরও এক সূত্র বলছে, সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে তিন বলয়ের কর্মীরা এখনো মনোনীত এম এ মালিকের ছাতার নিচে ঠিকভাবে একত্র হননি। তাদের প্রত্যাশা-চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকায় ব্যারিস্টার সালাম কিংবা কাইয়ুম চৌধুরী-এই দুজনের একজন জায়গা পাবেন। বছরের পর বছর ধরে মাঠে থাকা এসব তৃণমূল নেতা-সমর্থক তাই তাদের দীর্ঘদিনের নেতাকে ছেড়ে নতুন প্রার্থী মালিকের সঙ্গে যেতে অনাগ্রহী। ফলে মনোনীত হওয়ার পরও মালিক এখনো প্রত্যন্ত কমিটিগুলোর নেতাদের নিয়ে বড় রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু করতে পারেননি। তবে তিনি আশাবাদী-আগামী সমাবেশগুলোতে তৃণমূল তার সঙ্গে মিলিত হবে। কিন্তু বলয়ভুক্ত অনুসারীরা আছেন নিজ নেতার সংকেতের অপেক্ষায়। অন্যদিকে ব্যারিস্টার সালাম ও কাইয়ুম চৌধুরী দুজনেই অপেক্ষা করছেন রিভিউয়ের শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন পাল্টে যাওয়ার আশায়।
দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান হাবিব। তরুণ সাংসদ হিসেবে তিনি অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন, তাঁর গণজোয়ার ছিল স্পষ্ট। একসময়ের জাতীয় পার্টির তিনবারের এমপি মুকিত খানের দুর্গ এখন হাবিবের ঘাঁটি। এই জায়গায় বিএনপি ধানের শীষের বিজয় দেখতে চায়। কিন্তু মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সিলেট-৩ এখন তিন ভাগে বিভক্ত-মালিক, সালাম ও কাইয়ুম বলয়ে। মালিকের সঙ্গে অন্য দুই বলয় এখনো যুক্ত হয়নি। এই সুযোগ নিচ্ছে জামায়াত। নীরবে গণসংযোগ চালাচ্ছেন জামায়াত-মনোনীত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান। দক্ষিণ সুরমায় তিনি একসময় জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ছিলেন। লালাবাজার ইউনিয়নে জামায়াতের চেয়ারম্যান খায়রুল আফিয়ান টানা তিনবার নির্বাচিত। জালালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন লোকমান নিজেই। বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই বিভক্তি এবং জামায়াতের নীরব উত্তাপ মালিকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এমনকি আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে সাবেক এমপি হাবিবুর রহমান হাবিবের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংকও প্রভাব ফেলতে পারে। তবুও বিএনপি সব বাধা পেরিয়ে আসনটি দখলে নিতে চায়।
আসনজুড়ে দেখা গেছে-এখন তিনটি বলয়ই সমানভাবে চাঙা। মালিক বলয় ছাড়াও আছেন দলের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর বলয়। অতীতে প্রবাসে দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন মালিক। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে কাইয়ুম চৌধুরী মাঠে লড়াই করেছেন কর্মীদের নিয়ে। আন্তর্জাতিক প্রচারণায় আসনটির মানুষের দোরগোড়ায় তারেক রহমানের বার্তা নিয়ে সুরমার ঘুরেছেন ব্যারিস্টার সালাম। মালিক দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত আসনটিতে মূলত দুটি বলয়ই ছিল-সালাম ও কাইয়ুম। ইউনিয়ন থেকে গ্রাম পর্যন্ত সংগঠন শক্তিশালী করেছিলেন তারা। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দলের নির্দেশে মালিক দেশে ফিরে দ্রুত তিন উপজেলায় নিজের বলয় তৈরি করেন। এরপর মনোনয়ন দৌড়ে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি শোভাযাত্রা। প্রবাসী রাজনৈতিক অবদানের কারণে মালিক প্রাথমিক মনোনয়ন পান। কিন্তু মনোনয়ন পাওয়ার পরই তিনি কঠিন বাস্তবতায় পড়েছেন-অন্য দুই বলয়ের সমর্থকরা এখনো তার দিকে ঝুঁকেননি, বরং অপেক্ষায় আছেন চূড়ান্ত মনোনয়নে রদবদলের। সিলেট জেলা কৃষকদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও দক্ষিণ রমার লালাবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মো. নানু মিয়া বলেন, ‘যার হাতে দলের মার্কা, আমরা তার সঙ্গেই আছি। এখন দলের কঠিন সময়-হতাশা বা বিভেদের জায়গা নয়। ধানের শীষ যার হাতে যাবে, আমরা জিয়ার সৈনিক হিসেবে তার নির্দেশেই মাঠে কাজ করবো।’
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘দুঃসময়ে আন্দোলনে মাঠে ছিলাম আমি। তাই নেতাকর্মীরা রিভিউয়ের আশা করছেন। তবে চুড়ান্ত মনোনয়ন যার হবে, জেলার সভাপতি হিসেবে আমি বলবো-ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামতে।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম বলেন, ‘৪০ বছর ধরে দলের রাজনীতি করছি। প্রতিদিন মানুষের সেবা করি। তাই তৃণমূল চায় আমি মনোনয়ন পাই। এখানকার স্থানীয় বিএনপিও রিভিউ চায়। আমি এখনো আশা করি দল আমাকে বিবেচনায় নেবে।’
অপরদিকে মনোনীত প্রার্থী ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিক বলেন, ‘কোনো বলয় নেই এখানে-বিএনপির একটি বলয়ই থাকবে, ধানের শীষ ও তারেক রহমান। আমি আশাবাদী-সকলেই আগামী সমাবেশে আমার সঙ্গে মাঠে থাকবেন। ইনশাআল্লাহ, তৃণমূলকে নিয়েই এগিয়ে যাবো।’