আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ওয়াশিংটন ডি.সি.
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি পরাজয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিশ্ববাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার এক বিশেষ ঘোষণায় তিনি বিশ্বের সকল দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ ‘বৈশ্বিক শুল্ক’ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা একে ট্রাম্পের ‘সুরক্ষাবাদী’ নীতির এক আগ্রাসী প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।
প্রেক্ষাপট: সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়
গত ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে প্রেসিডেন্টের আগের ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালত জানান, প্রেসিডেন্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ঢালাও কর বসাতে পারেন না; এই ক্ষমতা একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের। এর ফলে বাংলাদেশের ওপর গত বছর আরোপিত ১৯-২০ শতাংশ শুল্কসহ বিভিন্ন দেশের ওপর বসানো বাড়তি করের আইনি ভিত্তি ধসে পড়ে।
ট্রাম্পের পাল্টা পদক্ষেপ: ‘ধারা ১২২’-এর ব্যবহার
আদালতের রায়ের পরপরই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘ধারা ১২২’ ব্যবহার করে নতুন প্রোক্লেমেশনে স্বাক্ষর করেন। এই ধারা অনুযায়ী, গুরুতর লেনদেনের ভারসাম্য (Balance of Payment) সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাময়িক শুল্ক আরোপ করতে পারেন।
-
কার্যকর: ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট (EST) থেকে।
-
হার: ১০ শতাংশ ‘অ্যাড ভ্যালোরম’ (পণ্যের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে)।
-
ব্যতিক্রম: জ্বালানি তেল, জরুরি ওষুধ, নির্দিষ্ট কৃষিপণ্য (গরু, টমেটো, কমলা), বই এবং মহাকাশ গবেষণা সরঞ্জাম এই শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব: সুযোগ ও ঝুঁকি
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আগের উচ্চ শুল্ক বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশের সামনে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় ঝুঁকি।
| বিষয় |
প্রভাব ও সম্ভাবনা |
| রপ্তানি খরচ |
আগে যেখানে ১৯-২০% শুল্ক ছিল, নতুন ঘোষণায় তা কমে ১০% হওয়ায় রপ্তানি খরচ প্রায় অর্ধেক কমবে। |
| আগের শুল্ক ফেরত |
আইনি জটিলতায় গত এক বছরে সংগৃহীত প্রায় ১০০-২০০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক ফেরত পাওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক উদ্দীপনা হতে পারে। |
| পোশাক খাতের ঝুঁকি |
নতুন ১০% শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের খুচরা মূল্য বাড়বে। এতে চাহিদা কমলে বাংলাদেশের ৪৬ লাখ শ্রমিকের (৮০% নারী) কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। |
| প্রতিযোগিতা |
ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও একই সুবিধা পাওয়ায় বাজারে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে। |
উল্লেখ্য: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’-এর আওতায় বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় এবং ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বৈশ্বিক চিত্র: ভারত ও উন্নয়নশীল দেশ
-
ভারত: রাশিয়ার তেলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক থেকে ১৮% ছাড় পাওয়ায় ভারতের জন্য প্রকৃত শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ১৩.৫%। এটি ভারতের টেক্সটাইল ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
-
অন্যান্য দেশ: ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের জিডিপি ০.৬ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর রপ্তানি আয় প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘রিসিপ্রোকাল শুল্ক চুক্তির’ চূড়ান্ত অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা।
২. নতুন শুল্কের এই ১৫০ দিন মেয়াদের মধ্যে ওয়াশিংটনের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা জোরদার করা।
৩. এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইইউ এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করা।