
ভক্তি রঞ্জন রায় | ৩ মার্চ, ২০২৬
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জুলাই আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নতুন করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ৭.৬২ ক্যালিবার বুলেট এবং পেশাদার স্নাইপার হামলার এক ভয়াবহ চিত্র, যা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পেছনের অদৃশ্য কারিগরদের নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেনের দাবি অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় নিহতদের অধিকাংশের মাথায় নিখুঁতভাবে গুলি করা হয়েছে। অনেক আহত ব্যক্তি হারিয়েছেন তাঁদের দৃষ্টিশক্তি। সামরিক ভাষায় একে বলা হয় 'সার্জিক্যাল প্রিসিশন', যা কেবল উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্নাইপারদের পক্ষেই সম্ভব। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন—বাংলাদেশ পুলিশের যেখানে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, সেখানে কারা চালিয়েছে এই টার্গেটভিত্তিক মারণাস্ত্র?
আলোচনার গভীরতা বাড়িয়েছে সাখাওয়াত হোসেনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, সাবেক সেনাকর্মকর্তাদের নিয়ে মহাখালীর শাহীন কমপ্লেক্স এলাকায় অবস্থানকালে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তাঁকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল:
"স্যার, আপনি স্নাইপারদের টার্গেট এরিয়ায় ঢুকে পড়েছেন, দ্রুত এলাকা ত্যাগ করুন।"
এই একটি তথ্য দুটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে দাঁড় করিয়েছে: ১. গোয়েন্দা সংস্থা যদি স্নাইপারদের অবস্থান জানত, তবে তাদের দমনে বা প্রতিরোধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? ২. এই স্নাইপাররা যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অংশ না হয়ে থাকে, তবে তারা কারা ছিল?
লেখক এখানে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি-বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটটি প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে এনেছেন। লিবিয়াতেও আন্দোলনের আগে তরুণদের বিদেশে নিয়ে সামরিক ও স্নাইপার প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে আগে থেকেই কোনো 'প্রফেশনাল কিলার' বা 'স্নাইপার সেল' প্রস্তুত করা হয়েছিল?
যদি বিদেশি বা দেশীয় কোনো তৃতীয় পক্ষ এই অভিযানে লিপ্ত থেকে থাকে, তবে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রসহ তারা কীভাবে দেশের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ও গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে রাজধানীতে এমন সমন্বিত অপারেশন চালাল, তা এক বিরাট রহস্য।
এই প্রশ্নগুলো এখন কেবল তর্কের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সত্যিই স্নাইপার ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র। আর যদি তা না হয়ে থাকে, তবে এই অভিযোগের স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
লেখকের ভাষায়—"রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায়, কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন চেপে রাখা যায় না।" জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ঠিক কী ঘটেছিল, ৭.৬২ ক্যালিবার বুলেটের ট্রিগারে কার আঙুল ছিল—সেই সত্য উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি।