স্বীকৃতি মিলেনি চার জনের সিলেটে জুলাই শহীদদের একাধিক পরিবারের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশায় হতাশা

প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২৫

স্বীকৃতি মিলেনি চার জনের সিলেটে জুলাই   শহীদদের একাধিক পরিবারের  প্রাপ্তি ও প্রত্যাশায় হতাশা

এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া: সাত সদস্যের পরিবারে তারেক ছিল একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। কম বয়সে সে বিয়ে করে। ২০২৪ এর ফেব্রুারিতে মারা যান বাবা। তার উপর আরও চাপ বাড়ে। ৬ মাস পর সেও চলে যায়। মা’সহ পরিবারের সদস্যরা এখন দিশেহারা। আমার ভাই বৈষম্য দুর করতে গিয়ে আজ তার পরিবারের সদস্যরা বৈষম্যের শিকার। জুলাই ফাউন্ডেশন বা প্রশাসনের একজন লোক আজও সরেজমিন আমাদের কোন খবর নেয়নি। তারা ঢাকায় বসে আর্থিক সহায়তার ভাগ করে দিলো মা ২০ ভাগ আর বউ (তারেকের স্ত্রী) ৮০ ভাগ পাবে। এই ভাগবাটোয়ার কারণে তারেকের স্ত্রী সামিয়া তার সন্তান রাফিকে নিয়ে পিতার বাড়ি চলে গেছেন। আমাদের কষ্ট থাকতো না যদি মায়ের অসহায়ত্বেবর কথা বিচেনা করে সমাধান করে দেওয়া হত। ভাইকে হারিয়ে এখন আমরা খুবই অসহায়। ধৈর্য্য ধরে আছি, যদি কেউ ফিরে থাকায়।

 

 

 

 

 

জুলাই আন্দোলনে গত বছরের ৫ আগস্ট বিয়ানীবাজার থানার সামনে গুলিত নিহত তারেক আহমদের বড় বোন বিএ সম্মান উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী তান্নি আক্তার এমন অসহায়ত্বের কথাই বলছিলেন। শুধু শহীদ তারেকের পরিবারে নয়, গোলাপগঞ্জে শহীদ তাজ উদ্দিন ও সিলেট সদরের ইনাতাবাদ গ্রামের ওয়াসিমের পরিবারসহ অনেকের পরিবার পড়েছে সহায়তার ভাগ নিয়ে বিভক্তিতে। বিশেষ করে যারা বিবাহিত ছিলেন। অনেক শহীদ পরিবারে বিভিক্তি না দেখা দিলেও প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা নিয়ে হতাশা রয়েছে। নিহত চার কিশোর ও তরুনের পরিবার সবচেয়ে বেশি হতাশাগ্রস্ত। তাদের এখনও প্রাপ্তি নেই। স্বীকৃতি পাওয়া প্রধান প্রত্যাশা হলেও মিলেনি সেই অর্জনও। কবে মিলবে এর উত্তরও পাচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সিলেট নগরীতে সাংবাদিক তুরাবসহ চার জন, জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৬ জন, বিয়ানীবাজারে ৩ জন ও গোয়াইনঘাটে তিন জন মারা যান। সিলেট জেলায় ১৬ জন শহীদের বাইরে জুলাই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন স্থানে মারা যান আরও তিন জন। তাদের মধ্যে রাজধানীর বাড্ডায় মারা যান সিলেট শহরতলীর বাসিন্দা ওয়াসিম, নারায়নগঞ্জের সিদ্দিরগঞ্জে বিয়ানীবাজারের চারখাই কাকুরা গ্রামের সুহেল আহমদ ও হবিগঞ্জ সদরে মারা যান সিলেটের টুকেরবাজারের গৌরিপুরের মোস্তাক আহমদ। তাদের স্বীকৃতি মিললেও ভাগ নিয়ে চলছে টানাপোড়ন। শহীদ পরিবারের অনেকেই ইতোমধ্যে জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকার চেক ও সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ছাড়াও বিএনপি, জামায়াত এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্টানসহ ব্যাক্তি পর্যায়ে অনুদান পাচ্ছেন। জেলায় নিহত ১৬ জনের মধ্যে চার জনের ভাগ্যে জুটেনি সহায়তা ও স্বীকৃতি।

 

 

 

 

 

 

 

এরা হলেন গোয়াইনঘাট সদরের ফেনাই কোনা গ্রামের তরুণ ব্যবসয়ী সুমন মিয়া, পশ্চিম জাফলংয়ের ইসলামবাদ গ্রামের শ্রমিক নাহেদুল, পান্থুমাই গ্রামের ৮ম শ্রেনির ছাত্র সিয়াম আহমদ রাহিম ও নগরীর ঝালোপাড়ার নিখিল চন্দ্র করের ছেলে সিএনজি অটোরিকশা চালক পংকজ কুমার কর। এদের মধ্যে পংকজের নাম তালিকায়ই আসেনি। অন্য তিন জন ৫ আগষ্ট স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় মারা যাওয়ার কারণে আপত্তি তুলে স্থানীয় প্রশাসন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রতিনিধিরা। ফলে তাদের স্বীকৃতি ভাগ্যে জুটেনি। এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন জেলার সদস্য সচিব ও সেসময়ের ছাত্রপ্রতিনিধি নুরুল ইসলাম জানান, মূলত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যাচাই বাচাই করে মতামত দেন। সেখানে তাদেরকে আন্দোলনে নিহতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়ে মামলা চলছে। এ বিষয়ে নিহত সুমনের পিতা আব্দুন নুর বিলাল সমকালকে বলেন, ৫ আগষ্ট বিজিবির সাথে সংঘর্ষে আমার ছেলেসহ তিন জন মারা যায়। এরকম ঘটনা ৫ আগষ্ট অনেক ঘটেছে। অন্যরা স্বীকৃতি পেলেও আমার ছেলে পাবে না কেন। তিনি বলেন আমরা প্রাপ্য সম্মান চেয়েছি। আবেদন করেও বিষয়টি সুরাহা হয়নি। শহীদদের অন্যতম সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব। ১৯ জুলাই নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় বিএনপির সমাবেশ কাভার করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যান। তার নামে একাধিক স্থানের নামকরণ হয়েছে। সরকার পতনের আগে ১০ লাখ টাকাও পায় তার পরিবার। তুরাবের মা মমতাজ বেগমের প্রত্যাশা ছেলের বিচার নিজ চোঁখে দেখে যাওয়ার। তুরাব শহীদের আগের দিন ১৮ জুলাই শাবিপ্রবি’র দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুদ্র সেন মারা যান।

 

 

 

 

 

তিনি নিজ জেলা দিনাজপুরের কোটায় মর্যাদা পেয়েছেন। নগরীতে শহীদদের আরেকজন সিএনজি অটোরিকশা চালক পংকজ কুমার কর। ৫ আগষ্ট কোতোয়ালী থানার সামনে গুলিতে মারা যান তিনি। পরদিন তার লাশ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তার নাম তালিকায়ই আসেনি। এজন্য তার পিতা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন। একই দিন সিলেট সার্কিট হাউসের সামনে গুলিতে মারা যান পাবেল আহমদ কামরুল। তিনি গোলাপগঞ্জ ঢাকাদক্ষিণের কানিশাইল গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে। কামরুলের পিতা পেশায় কৃষক রফিক উদ্দিন জানান, সহায়তা নিয়ে পরিবারের কোনো সমস্যা হচ্ছেনা। কিন্তু সরকারের কাছে যে প্রত্যাশা রয়েছে তা পুরণ হচ্ছে না। জুলাই আন্দোলনে ৪ আগষ্ট সবচেয়ে তুমুল সংঘর্ষ হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। ওইদিন পৃথক স্থানে গুলিতে মারা যান ৬ জন। এদের একজন উপজেলার বারকোট গ্রামের মৃত মকবুল আলীর ছেলে তাজ উদ্দিন। তার স্ত্রী রুলি বেগম সমকালকে জানান স্বামী মারা যাওয়ার চার মাস পর ঝামেলা দেখা দেয়।

 

 

 

 

 

 

এক সময় পিতার বাড়িও চলে যান। সরকারি সহায়তার মধ্যে নিজের নামে ১০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড পেয়েছেন। অন্যান্য সুবিধার মেধ্যে ৮০ ভাগ তিনি ও ২০ ভাগ স্বামীর পরবিার পায়। এ নিয়ে সমস্যার কারণে আলাদা খাচ্ছেন। এ উপজেলার অন্য শহীদরা হলেন ধারাবহর গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে নাজমুল ইসলাম, রায়গড় গ্রামের সুরাই মিয়ার ছেলে জয় আহমদ (হাসান), ঘোষগাওয়ের মোবারক আলীর ছেলে গৌছ উদ্দিন, পশ্চিম দত্তরাইল গ্রামে আলা উদ্দিনের ছেলে মিনহাজ আহমদ ও শিলঘাট লম্বা গাঁও গ্রামের কয়সর আহমদের ছেলে সানি আহমদ। এসব শহীদ পরিবারের আক্ষেপ প্রায় সমান। শহীদ মিনহাজের বড় ভাই আবুল কালাম অভিযোগ করেন প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেও শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় গোলাপগঞ্জে কোনো চত্বর বা সৌধ করা যায়নি। সকল শহীদ পরিবারের পক্ষে লিখিত আবেদন করেছিলাম। অথচ অন্যস্থানে নিহত একজন শহীদের নামে একাধিক নামকরণ হয়েছে। এটাকি আমাদের সাথে বৈষম্য নয়? একাধিক উপদেষ্ঠা সিলেটে আসলেও একজন ছাড়া কারো বাড়ি যাননি। বিয়ানীবাজারে ৫ আগষ্ট তারেক ছাড়াও একইদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে গুলিতে মারা যান নয়াগ্রামের ময়নুল ইসলাম ও ফারুক আহমদের ছেলে রায়হান উদ্দিন। সবজি বিক্রেতা নিহত ময়নুলের স্ত্রী শিরিন বেগম জানিয়েছেন তিনি সন্তান নিয়ে পরিবারে রয়েছেন। ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সরকারের কাছে তিনি একটি ঘরের ব্যবস্থা ও সন্তান্তদের ভবিষ্যতের জন্য সহায়তা চান। রাজধানীর বাড্ডায় শহীদ হন সিলেট সদরের ইনাতাবাদ গ্রামের কনর মিয়ার ছেলে ওয়াসিম। জুলাই ফাউন্ডেশনের প্রদত্ত ৫ লাখ টাকার অনুদান এখনো জুটেনি শহীদ ওয়াসিমের পরিবারে। এর আগে ভাগ নিয়ে বিভক্তি শুরু হয় ওয়াসিমের আপন বড় বোন শীপা বেগমের সাথে। পিতার একাধিক সংসার থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিপা জানান তার মা মারা যাওয়ার পর পিতা কনর মিয়া আর কোনো খবর নেননি তাদের। ওয়াসিমকে তিনি বড় করেন। খন সরকারের সুযোগ সুবিধার কথা শুনে পিতা ঝামেলা সৃষ্টি করছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনসহ অনেকের দ্বারস্থ হলেও কারো কাছে সুবিচার মিলছেনা বলে দাবি করেন শিপা। আর্থিক সহায়তার ভাগ নিয়ে পরিবারে বিভক্তি প্রসঙ্গে সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ জানান অনেক পরিবারে এমন সমস্যার কারণে আবেদনও করেছেন। কিন্তু বিষয়টি জুলাই ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় দেখছে। শহীদের পরিবারের যারা অসহায় তাদেরকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে আবেদন করতে বলেছি। চার জনের স্বীকৃতি না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুরুর দিকে স্থানীয় তদন্ত ও ছাত্রপ্রতিনিধিদের আপত্তির কারণে তাদের নাম তালিকায় উঠেনি। এ নিয়ে আদালতে নিহতের পরিবার ও বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা চলছে। এটা নিস্পত্তির পরে তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ নিউজ