
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
দুবাই/ওয়াশিংটন: মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধ এবং চীনের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে রাশিয়ার প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি বিশ্বরাজনীতিকে এক বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া এই অবরোধে ইরানের কোনো বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজ ঢুকতে বা বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। মিশনে মোতায়েন করা হয়েছে:
১৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ (১টি সুপার-ক্যারিয়ার ও ১১টি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ)।
কয়েক ডজন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।
১০ হাজারের বেশি মার্কিন মেরিন ও এয়ারম্যান।
সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ছয়টি বড় মালবাহী জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং তারা পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও একটি জাহাজ অবরোধ এড়ানোর গুঞ্জন উঠেছিল, তবে বর্তমানে সেটি প্রণালির ভেতরে আটকা পড়ে আছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বের মোট এলএনজির ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ২৫ শতাংশ এই ২১ মাইল চওড়া প্রণালি দিয়ে যায়। ইরানের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা চীন এই অবরোধে মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বেইজিংয়ের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশই আসে ইরান থেকে।
ঠিক এই সংকটকালেই বেইজিং সফররত রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এক ‘যুগান্তকারী’ ঘোষণা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, “রাশিয়া চীনের এই সম্পদ ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম। পুতিন ও সি চিন পিংয়ের বন্ধুত্ব যেকোনো ঝড় মোকাবিলায় অটল।” বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এই সুযোগে চীনের বাজারে নিজেদের আধিপত্য পাকাপোক্ত করে ওয়াশিংটনের অবরোধকে অকার্যকর করার ছক কষছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।
তেলের দাম: বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
পরিবহন খরচ: জ্বালানির দাম বাড়লে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ সংকট: পেট্রলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হতে পারে, যা আসন্ন নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন এখানে এক বড় ‘জুয়া’ খেলছে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য শুধু ইরানকে নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং বৈশ্বিক ‘এনার্জি চোকপয়েন্ট’-এ মার্কিন আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা।
তবে ইরান ইতিমধ্যে পাল্টা প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, চীন-রাশিয়া জোটের সমন্বয় এবং ইরানের সামরিক অবস্থান বিশ্বকে কি একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়, নাকি নতুন কোনো অর্থনৈতিক মেরুকরণের জন্ম দেয়। আপাতত হরমুজ প্রণালির নীল জলরাশিতে কেবল মার্কিন রণতরির গর্জন আর ড্রোনের টহল এক অস্থির ভবিষ্যতের সংকেত দিচ্ছে।