
বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত ম্যাগমায় ঢাকা এক অনাবাসযোগ্য পাথুরে গ্রহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্রহই রূপ নিয়েছে আজকের নীল-সবুজ, প্রাণে ভরপুর পৃথিবীতে। তবে এই রূপান্তরের পূর্ণ ইতিহাস এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা পৃথিবীর অতীত, গভীরতা ও অদ্ভুত প্রাকৃতিক আচরণ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে।
সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানায়, চলতি বছরে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শিলার বয়স নির্ধারণ করেছেন, গভীর সমুদ্রের তলদেশে আবিষ্কার করেছেন জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, চৌম্বক উত্তর মেরুর গতিপথে বড় পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন এবং এমনকি পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সোনা ওপরে উঠে আসার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন।
কানাডার উত্তর কুইবেক অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় অবস্থিত ‘নুভভুয়াগিত্তুক’ শিলা গঠনকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত ভূত্বকের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। গত জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, এই শিলার বয়স প্রায় ৪১৬ কোটি বছর, যা পৃথিবীর প্রথম ভূতাত্ত্বিক যুগ ‘হেডিয়ান’-এর সময়কার।
ওই সময় পৃথিবী ছিল অস্থির ও অত্যন্ত উত্তপ্ত। গবেষকদের ধারণা, এই শিলায় সেই যুগের সম্ভাব্য জীবনের প্রাথমিক চিহ্ন সংরক্ষিত থাকতে পারে। তবে শিলাটিতে জিরকন খনিজের অনুপস্থিতির কারণে এর বয়স নির্ধারণ নিয়ে এখনো বৈজ্ঞানিক বিতর্ক রয়েছে।
লোককথায় পরিচিত ‘উইল-ও-দ্য-উইস্প’—জলাভূমির ওপর ভেসে থাকা রহস্যময় আলো—এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে ২০২৫ সালে। গবেষকেরা জানান, মিথেন গ্যাসের ক্ষুদ্র বুদ্বুদের ভেতরে সৃষ্ট ‘মাইক্রোলাইটনিং’ থেকেই এই আলো তৈরি হয়।
গত মার্চে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বলা হয়, প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে এই ধরনের ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক ঝলক জীবনের মৌলিক রাসায়নিক উপাদান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পৃথিবীর চৌম্বক উত্তর মেরু দীর্ঘদিন ধরেই স্থান পরিবর্তন করছে। ১৯৯০-এর পর এর গতি বেড়ে গেলেও ২০১৫ সালের পর আবার ধীর হতে শুরু করে। ২০২৫ সালে বিজ্ঞানীরা ‘ওয়ার্ল্ড ম্যাগনেটিক মডেল’ হালনাগাদ করেছেন, যা বিমান ও নৌযান চলাচলের জিপিএস ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন তথ্য অনুযায়ী, চৌম্বক উত্তর মেরু বর্তমানে কানাডা থেকে সরে রাশিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এর গতি আরও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়া ও আলাস্কার মধ্যবর্তী গভীর সমুদ্র খাদে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৫ হাজার ৮০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মিটার গভীরে বসবাসকারী এই প্রাণীরা সূর্যালোক ছাড়াই টিকে থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া মিথেন উৎপাদন করে, যা ঝিনুক ও টিউবওয়ার্মের মতো প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের অন্যতম আলোচিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর কঠিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের ঘূর্ণন দিক পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর গঠনে বিকৃতি দেখা যাচ্ছে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো—পৃথিবীর কেন্দ্রে থাকা সোনা ধীরে ধীরে ওপরের স্তরের দিকে উঠে আসছে।
হাওয়াইয়ের শিলায় পাওয়া বিশেষ রাসায়নিক সংকেত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, অতি সামান্য পরিমাণে হলেও কেন্দ্র থেকে সোনা লিক হয়ে ভূত্বকের দিকে চলে আসছে। ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে পৃথিবীর গভীর থেকে আরও মূল্যবান ধাতু ওপরে উঠে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের এসব আবিষ্কার প্রমাণ করে—পৃথিবী এখনো তার অসংখ্য রহস্য লুকিয়ে রেখেছে, আর প্রতিটি নতুন গবেষণাই আমাদের গ্রহকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করছে।