রাজনৈতিক বিশ্লেষক | ঢাকা
বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল ‘এক বাক্সে ভোট’ বা বৃহত্তর ঐক্য। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই প্রচেষ্টা এখন চরম নাটকীয়তায় পর্যবসিত হয়েছে। আসন ভাগাভাগি, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে ইসলামি দলগুলো এখন তিনটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজন ইসলামপন্থীদের সম্মিলিত শক্তিকে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তেমনি ভোটের সমীকরণকেও করে তুলেছে জটিল।
১. জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ‘১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’
৫ আগস্টের বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম গড়ার চেষ্টা করে। এই মোর্চায় জামায়াতের সাথে রয়েছে:
-
প্রধান শরিক: মাওলানা মামুনুল হকের ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস’, খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলাম পার্টি।
-
কৌশলগত শরিক: লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)।
-
কৌশল: সেক্যুলার দল ও বৈষম্যবিরোধী শক্তির প্রতিনিধিদের এই জোটে টেনে জামায়াত তাদের ‘মৌলবাদী’ তকমা ঘোচানোর চেষ্টা করছে। আসন সমঝোতা অনুযায়ী, ১৭৯টি আসনে জামায়াত নিজে লড়বে এবং বাকি আসনগুলো শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে।
২. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘একলা চলো’ নীতি
সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর শেষ মুহূর্তে তারা বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
-
মূল অভিযোগ: দলটির দাবি, জামায়াত তাদের উপেক্ষা করেছে এবং আসন বণ্টনে ‘ইনসাফ’ করেনি। ইসলামী আন্দোলন ৮০টি আসন চাইলেও জামায়াত ৩০-৩৫টির বেশি দিতে রাজি ছিল না।
-
অবস্থান: তারা ২৬৮টি আসনে একক প্রার্থী দিয়েছে এবং ৩২টি আসনে সমমনাদের সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে। চরমোনাই পীর নিজেকে জামায়াতের বিকল্প একটি ‘তৃতীয় শক্তি’ বা ‘থার্ড পোল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
৩. বিএনপি-ঘেঁষা ইসলামি ধারা
কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটের একটি বড় অংশ এবার বিএনপির বলয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছে। তারা মনে করছে, জামায়াতের সাথে আদর্শিক পার্থক্যের কারণে বিএনপির ছায়াতলে থেকেই কওমি স্বার্থ রক্ষা করা সহজ হবে। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো এলাকাগুলোতে এই ধারাটি জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।
বিচ্ছেদের নেপথ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিভক্তির পেছনে শুধু আসন নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে:
-
ভবিষ্যৎ সরকার নিয়ে সন্দেহ: ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগ, জামায়াত আগেই বিএনপির সাথে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের গোপন সমঝোতা করেছে।
-
শরিয়া ও নারী অধিকার: জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সরাসরি শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে না—এমন বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন আপত্তি জানিয়েছে।
-
ইগো ও মর্যাদা: জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শরিকদের ছাড়াই আসন ঘোষণা করাকে ‘অসম্মান’ হিসেবে দেখছে ইসলামী আন্দোলন।
ভোটের মাঠে প্রভাব
ইসলামি ভোট তিনটি বাক্সে ভাগ হয়ে যাওয়ার সরাসরি সুবিধা পাবে বিএনপি বা অন্যান্য বড় দলগুলো।
-
ভোটের বিভাজন: জামায়াতবিরোধী আলেমদের একটি অংশ জামায়াতকে ঠেকাতে সক্রিয় হতে পারে।
-
মামুনুল হক ফ্যাক্টর: জামায়াতের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবেন মাওলানা মামুনুল হক। কওমি মহলে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা জামায়াতকে কিছু ভোট ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
উপসংহার: ২০২৬-এর নির্বাচন প্রমাণ করল যে, বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো এখনো একটি সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ। নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নেশায় শেষ পর্যন্ত কার পাল্লা ভারী হবে, তা ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটেই নির্ধারিত হবে।