
সুনির্মল সেন:
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুমোদনের গণভোট। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পররাষ্ট্র নীতি এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের আওয়ামী লীগ-কেন্দ্রিক কূটনৈতিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নতুন মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশল (NDS 2026) অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বৈশ্বিক অভিভাবকের ভূমিকা থেকে কিছুটা সরে এসে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর দায়িত্ব বাড়াতে চাচ্ছে। এই নীতির অংশ হিসেবে তারা বাংলাদেশের নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ বা প্রভাব বিস্তারের বদলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বেশি আগ্রহী। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এবার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে না। তবে একটি ‘ইনডিপেনডেন্ট’ (স্বাধীন) পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে পারে। পর্যবেক্ষকদের এই অনুপস্থিতি নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
এদিকে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের নিয়ে একটি ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন ও বৃহৎ দলকে ছাড়া নির্বাচন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি হতে পারে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালেও ভারত আওয়ামী লীগকে সংগঠিত হতে সহায়তা করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক নয়’ হিসেবে তুলে ধরার কূটনৈতিক দূতিয়ালি করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের উদাহরণ টেনে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। সে সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচন আওয়ামী লীগের বর্জনের কারণে মাত্র ২১ দিন টিকে ছিল। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এবারও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গঠিত সংসদ একই ধরনের বৈধতা সংকটে পড়তে পারে কি না। যদিও বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নির্বাচনকে একটি ‘আদর্শ নির্বাচন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার প্রথমবারের মতো ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ এবং কেন্দ্রীয় সিসিটিভি ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। ইসির মতে, নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যা তাদের ভাষায় একটি ব্যাপক জনসমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।
সারসংক্ষেপ: ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে সম্পর্কের এক অগ্নিপরীক্ষা। ১২ ফেব্রুয়ারির পর নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়াই ঠিক করে দেবে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ।